সময়ের সাথে যুদ্ধে শিক্ষার্থীরা সিলেবাস শেষ করতে

বনলতা নিউজ ডেস্ক.বনলতা নিউজ ডেস্ক.
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০১:২৪ PM, ০৪ জুন ২০২০

বনলতা নিউজ ডেস্ক.
করোনার সংক্রমণের জেরে গত ১৮ মার্চ থেকে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ। এর ফলে বছরের নির্দিষ্ট শ্রেণির যে নির্দিষ্ট সিলেবাস বা পাঠ্যক্রম, তা শেষ হবে কী করে? ছাত্রছাত্রীরা কতটা শিক্ষা নিয়ে পরের ক্লাসে উঠতে পারবে? অনির্দিষ্টকালের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষাবর্ষের নির্ধারিত সিলেবাস শেষ করতে হলে এখন সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ইংরেজি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাবর্ষ ধরা হয়। বছরের শুরুতে প্রায় আড়াই মাস ক্লাস হয়েছে। এরপর গত ৮১ দিন ধরে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ। পরিস্থিতি যা বোঝা যাচ্ছে, তাতে অন্তত আরো দেড়-দুমাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে। এরপরে বছরের তিন-চার মাস থাকবে। এই সময়ের মধ্যে সিলেবাস কিভাবে শেষ হবে সেটি নিয়েই বড় প্রশ্ন।

জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, সিলেবাস ছোট করে কিংবা অটো প্রমোশন দিয়ে কিন্তু বিষয়টির সমাধান হবে না। আমি জানি না সমাধানটা কি হতে পারে। তবে এটুকু বলতে পারি উন্নত দেশগুলো এক্ষেত্রে কি সিদ্ধান্ত নেয় সেটি দেখতে হবে এবং এর আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আরেক শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেছেন, আমাদের দেশে এমন আহামরি কোনো পড়াশুনা হয় না যে তিন মাস ছয় মাস ক্লাস না হলে খুব বড় ক্ষতি হয়ে যাবে? বাচ্চাদের ‘ফার্মের মুরগি’ না বানিয়ে বাড়িতেই পড়াশুনা চালিয়ে নেয়ার কথা বলেছেন। বাড়িতে বসেও পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে স্কুল চালু করার পর শিক্ষকদের বিশেষ সম্মানী

দিয়ে ছুটির দিনেও ক্লাসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। চলতি বছরের পাবলিক পরীক্ষা জেএসসি ও পিএসসি বাতিল করা উচিত। বছরের যে আড়াই মাস ক্লাস হয়েছে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার্থীদের পরবর্তী ক্লাসে প্রমোশন দেয়া যেতে পারে। অনলাইনে উচ্চ মাধ্যমিকের ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করে রাখা উচিত। এর ফলে যেদিন থেকে কলেজ চালু হবে সেদিন থেকেই তারা একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু করতে পারবে। তিনি বলেন, করোনায় সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে-আর্থিক অনটনের কারণে বহু অভিভাবক হয়তো তার সন্তানকে আর পড়াশুনাই করাতে পারবেন না। এক্ষেত্রে কত শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে তা বোঝা যাচ্ছে না। যদি সত্যি সত্যি এমনটি ঘটে যায় তাহলে এটি হবে ভয়ংকর ক্ষতি। এই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য এখন থেকেই কাজ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

শিক্ষাপঞ্জি ঘেঁটে দেখা গেছে, করোনার কারণে আগামী ৭ জুন পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৭ দিন এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রায় এক মাস পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। প্রায় একইচিত্র মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষায়ও। শিক্ষকরা বলেছেন, নানা বিকল্প উপায়ে শ্রেণি কার্যক্রমের এই ঘাটটি পুষিয়ে দেয়া যাবে। তবে দীর্ঘ এই ছুটির ফলে পড়াশুনার যে ‘রুটিন’ ছিল তা একেবারেই ধসে পড়েছে। জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেছেন, সব কিছুই নির্ভর করবে পরিস্থিতির ওপর। এবার শিক্ষাবর্ষের হিসাবে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতির কারণে এবার অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষা নেয়ার সময়ই নেই। বার্ষিক পরীক্ষা হবে কি না, হলে কবে হবে, কোন সিলেবাসের উপরে, কতটুকু সিলেবাসের উপরে হবে, পরীক্ষাটি এই ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে নাকি শিক্ষাবর্ষ আগামী বছরের কয়েক মাসের মধ্যে নিয়ে গিয়ে এগুলো সমন্বয় করার প্রচেষ্টা চালাব, সেটা নির্ভর করবে এই মহামারি পরিস্থিতি থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার মতো অবস্থায় যখন পৌঁছাতে পারি তখন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা যেন পিছিয়ে না পড়ে সেজন্য বহু পদক্ষেপ নিয়ে রাখা হয়েছে। যখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু হবে তখন যে পদক্ষেপ কাজে লাগবে সেটিই করা হবে। সবমিলিয়ে এই সময় যে ক্ষতি হয়েছে প্রতিষ্ঠান খোলার পর তা পুষিয়ে দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।

এদিকে, শিক্ষাপঞ্জি ঘেঁটে দেখা গেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ১৮ মার্চ থেকে করোনার জন্য ছুটি দেয়া হয়েছে। ১৮ মার্চ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত মোট দিনের সংখ্যা ৮১ দিন। এর মধ্যে মোট শুক্রবার ১২ দিন। পূর্ব নির্ধারিত সরকারি ছুটি ছিল ৪৪ দিন। প্রথম সাময়িক পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত ৭ দিন। ফলাফল প্রকাশের জন্য ১ দিন। অর্থাৎ করোনা পরিস্থিতি না হলেও ৮১ দিনের মধ্যে পরীক্ষা নেয়া, ফলাফল দেয়া, শুক্রবার, রমজান ও গ্রীষ্মকালীন ছুটির জন্য ৬৪ দিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকতে। তাহলে বলা যায় যদি ৭ জুন বিদ্যালয় খোলা হতো তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাকুল্য ১৭ দিন শ্রেণি কার্যক্রম হতে বঞ্চিত হবে বা হয়েছে। এ ঘাটতি পূরণ করতে সংসদ টিভিতে অনেক ক্লাস প্রচার করা হয়েছে। তাছাড়া মাত্র ১৭ দিনের এ ঘাটতি প্রাথমিক শিক্ষকরা ‘পাঠ পরিকল্পনা’ করে খুব সহজেই পুষিয়ে নিতে পারবেন। তবে মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে করোনা পরিস্থিতিতে স্কুল বন্ধ থাকায় গত ৮১ দিনের মধ্যে প্রায় এক মাস শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ ছিল। জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ফসিউল্লাহ বলেন, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে আমরা সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে পাঠদান করছি। স্কুল খোলার পর বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করে ক্ষতি পোষানোর চেষ্টা করব।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, করোনার কারণে শিক্ষা কার্যক্রমের ঘাটতি পোষাতে যেসব বিকল্প প্রস্তাব রয়েছে সেগুলোর মধ্যে হচ্ছে শিক্ষাবর্ষের সময় বাড়ানো এবং মায়েদের মাধ্যমে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেয়া। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনোটিই কার্যকর করা হয়নি। দেশে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাবর্ষ। করোনার কারণে বছরের প্রায় অর্ধেকসময় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) মাধ্যমে একটি প্রস্তাব করা হয়েছিল, শিক্ষাবর্ষ আগামী ফেব্রুয়ারি কিংবা মার্চ মাস পর্যন্ত করতে। জানতে চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেছেন, শিক্ষাবর্ষের সময় বাড়ানো নিয়ে তার দপ্তর থেকে কোনো প্রস্তাবনা দেয়া হয়নি। মাসখানেক আগে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল সভা হয়েছিল। ওই সভায় কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

আপনার মতামত লিখুন :