নানা অবহেলায় হিজড়া সম্প্রদায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পিছিয়ে

বনলতা নিউজ ডেস্ক.বনলতা নিউজ ডেস্ক.
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০২:২০ PM, ২১ জুলাই ২০২০

ফজলুল করিম বাবলু:
স্মৃতি হাতড়ালে এখনো যে বিষয়টা অস্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে, শৈশবের অবুঝ চোখে সেইকালে বুঝে উঠতে পারতাম না, কারো বাড়িতে সন্তান জন্ম নিলে শাড়ি পরা সত্ত্বেও বিচিত্র সাজ-পোশাক নিয়ে কোত্থেকে যেসব মহিলা এসে নাচগান বা ঠাট্টা-মশকরা করে তারপর বখশিস নিয়ে খুশি হয়ে চলে যেতো, এদের আচার আচরণ ও বহিরঙ্গে দেখতে এরা এমন অদ্ভুত হতো কেন ! শৈশবের অনভিজ্ঞ চিন্তা-শৈলীতে পুরুষ ও নারীর পার্থক্যের জটিলতা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা না জন্মালেও স্বাভাবিকতার বাইরে দেখা এই অসঙ্গতিগুলো ঠিকই ধরা পড়েছে, যা প্রশ্ন হয়ে বুকের গভীরে জমে ছিলো হয়তো। পরবর্তী জীবনে তা-ই কৌতুহল হয়ে এক অজানা জগতের মর্মস্পর্শী পীড়াদায়ক বাস্তবতাকে জানতে বুঝতে আগ্রহী করে তুলেছে। আর তা এমনই এক অভিজ্ঞতা, যাকে প্রকৃতির নির্মম ঠাট্টা বা রসিকতা না বলে উপায় থাকে না।
হিজড়া দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যবহৃত একটি পরিভাষা বিশেষ করে, ভারতের রূপান্তরকামী বা রূপান্তরিত লিঙ্গের নারীদের বুঝিয়ে থাকে। ভারতের বিভিন্ন স্থানে, রূপান্তরিত লিঙ্গের হিজড়ারা আরাভানি, আরুভানি এবং জাগাপ্পা নামেও পরিচিত। বাংলা ভাষায়, হিজড়া বলতে আন্তঃলিঙ্গ ব্যক্তিবর্গকেও বোঝানো হয়, অর্থাৎ চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ক্রোমোজোমের ত্রুটির কারণে জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, যাদের জন্মপরবর্তী লিঙ্গ নির্ধারণে জটিলতা দেখা দেয়।
পাকিস্তান ও বাংলাদেশে, হিজড়াগণ সরকার কর্তৃক আইনগতভাবে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃত। যারা সম্পূর্ণরূপে পুরুষ বা নারী কোনটাই নয়। ভারতেও, রূপান্তরিত লিঙ্গের ব্যক্তিবর্গকে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সমাজ কর্তৃক পরিত্যাজ্য হওয়া সত্ত্বেও তাদের অধিকারকে আইনগতভাবে সুরক্ষিত করা হয়েছে। সমাজকর্মী ও রূপান্তরিত লিঙ্গের সম্প্রদায়ের সদস্যরা তাদেরকে সাধারণত খাওয়াজা সিরা নামে চিহ্নিত করে এবং এসকল ব্যক্তিবর্গকে রূপান্তরকামী ব্যক্তি, রূপান্তরিত লিঙ্গের ব্যক্তি, ক্রস-ড্রেসার বা আন্তঃলিঙ্গীয় পোশাকধারী বা খোঁজা বলে ডেকে থাকে।
সে যাই হোক বাংলাদেশের হিজড়াদের সরকার তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তারা এখন ভোটার হতে পারছে। সমাজে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে সক্ষম হচ্ছে। তাদের দাবী সমুহ সরকারের নিকট তুলে ধরতে পারছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার কারনে তারা কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছাতে পারছেনা। এ নিয়ে আজ মঙ্গলবার দুপুরে কথা হয় কয়েকজন হিজড়া নেত্রী ও সাধারণ হিজড়াদের সাথে। তারা তাদের বেদনাদায়ক কথাগুলো এলোমেলোভাবে প্রতিবেদকের নিকট তুলে ধরেন।
এর মধ্যে রাজশাহীর বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা দিনের আলো হিজড়া সংঘের সাধারণ সম্পাদক সাগরীকা খান বলেন, তিনি অনেক কষ্ঠ করে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছিলেন। সাগরীকার বাড়ি নওগাঁর মান্দাতে। তিনি সেখানে শিশু, কৈশর ও যৌবনকাল কাটিয়েছেন। এখন তিনি রাজশাহীতে বসবাস করেন। তারা দরীদ্র ছিলেন। এছাড়াও তারা বেশ কয়েকটি ভাইবোন। তিনি বলেন, ছোট বেলায় তিনি একা একা স্কুলে যেয়ে ছোট ওয়ানে ভর্তি হন। এরপর থেকে শুরু হয় তার লেখাপড়া। বড় হতে থাকলে তার শরীতে পরিবর্তন আসতে থাকে। তিনি ছেলেদের পোষাক পরিধান করলেও চলাফেরা ও আচরন মেয়েদের মত হতে থাকে। এতে করে তার পরিবারের সদস্য এবং সমাজ ও গ্রামবাসী বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি। তিনি সংসারের যাবতীয় কাজ করলেও কারো মন পেতনা। স্কুলে যাওয়ার বিষয়ে পরিবার থেকে আগ্রহ দেখাতো না। ভাল পোষাক দিতনা। এছাড়াও স্কুলের সহপাঠী ও শিক্ষকদের অসহযোগিতা, অবহেলা ও টিটকারীমূলক কথা ও অসৌজন্যমূলক আচরনের জন্য এক সময় তিনি লেখাপড়া বন্ধ করে দেন।
এদিকে অত্র সংস্থার সহ-সাধারণ সম্পাদক জয়িতা পলি বলেন, প্রাথমিকের গন্ডি পার হতেই কিংবা চতুর্থ থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে উঠতেই তাদের শরীরে অন্যরকম উপর্সগ দেখা দেয়। এরপর হাইস্কুলে পা দিলে ঘটে বিপত্তি। তাদের শরীরে মেয়েলি ভাব ফুটে উঠে। তখন তারা পড়েন মহাবিপদে। না পারেন ছেলেদের সাথে বসতে না পারেন মেয়েদের সাথে থাকতে। এ নিয়েও তাদের লেখাপড়ায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। শুধু তাই নয়। তখন থেকে পরিবার ও সমাজের লোকজন বিষয়টি অন্য চোখে দেখতে শুরু করে। পরিবারের সদস্যদের নানান কথা বলতে থাকে। এতে বাবা, মা, ভাই-বোন সবাই মুখ ফিরিয়ে নিতে থাকে।
তিনি আরো বলেন, পড়ালেখা করিয়ে কোন লাভ হবে না বলে পরিবারের সদস্যরা বাধা প্রদান করেন। বই পুড়িয়ে দেয়। ছিঁড়ে ফেলে। সেইসাথে স্কুলের সহপাঠিরা নানান কথা বলে। জড়িয়ে ধরে। পাশে বসতে নেয় না। এমনকি শিক্ষকরাও যখন কথা বলে অঙ্গভঙ্গি করে কথা বলেন। এই অবস্থায় নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে তারও লেখাপড়া নবম শ্রেণিতে গিয়ে শেষ হয় বলে জানান পলি। এরপর তিনি চলে আসেন গুরুর নিকট। কিন্তিু তিনি থেমে নেই বিভিন্ন সংস্থার সাথে যুক্ত হয়ে নিজে আয় করে এখন আবার লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন তিনি উন্মুক্ত বিশ্ববিদালয়ে লেখাপড়া করছেন। তিনি আরো বলেন, গত মাস খানেক পূর্বে স্কলারশীপ নিয়ে তার আমেরিকা যাওয়ার কথা ছিলো। করোনার কারনে তা বন্ধ আছে। আমেরিকার যেয়ে কথার বলার জন্য ইংরেজি ভাল করে শেখার লক্ষে বেশ কয়েকজন শিক্ষকের নিকট গেওে তারা তাকে স্পোকেন ইংলিশ শিখতে নেয়নি বলে জানান পলি। পলিরমত নদী, জুঁই ও শাবনুরও একই ধরনের বর্ণনা দেন।
দিনের আলো হিজরা সংঘের সভাপতি মোহনা বলেন, এই জনগোষ্ঠিকে এগিয়ে নিতে লেখাপড়ার কোন বিকল্প নাই। এ সব শিশুই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি। কেউ নিজে থেকে হিজড়া হয়ে জন্ম নেয় না। বিশেষ একটি হরমোনের কারনে তাদের এই অবস্থা হয়। তারা উভয় লিঙ্গের ন্যায় হয়ে যায়। কিন্তু তারাও মানুষ। মানুষ মনে করে এই ধরনের প্রতিটি শিশুকে স্কুলে পাঠানোর জন্য আভিাবকদের অনুরোধ করেন। সেইসাথে পরিবার, সমাজ, দেশ ও স্কুলের কর্ণধারদের তাদের সুযোগ করে দেয়ার দাবী জানান। তারা লেখপাড়া শিখলে কারো প্রতি অন্যায় আচরণ করবেনা। অঙ্গভঙ্গি করে অর্থ উপার্জন করতে হবেনা। নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারবে। সমাজে বোঝা হয়ে থাকবেনা। কারন কেউ চায়না অপরের নিকট হাত পেতে তারা জীবন ধারন করবে। হিজড়ারা শিক্ষিত হলে দেশ ও জাতির উন্নয়নে কাজ করবে বলে জানান মোহনা। তাদের শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা দূর করতে শিক্ষা সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করেন।

আপনার মতামত লিখুন :