ম্যাসেঞ্জারে  খুদেবার্তা সমাচার এবং সর্তকতা !

Md MagemMd Magem
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৫:৩৭ AM, ২৮ জুলাই ২০২০

প্রভাষক মো.মাজেম আলী মলিন.
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে ম্যাসেঞ্জারে খুব পরিচিতজনকে (শিক্ষিত/মুর্খ/স্বশিক্ষিত) দেখা যায় নানা রকম উদ্ভট ম্যাসেজ আদান-প্রদান করতে। সে সব ম্যাসেজ তার নিজের লেখা না। ওই ব্যক্তি কারো কাছ থেকে পেয়েছে। সেই ম্যসেজে লেখা আছে অন্য আরও একশ জনকে ফরোয়ার্ড করতে, সেও তাই করছে। আবার সে যাকে পাঠাচ্ছে, তার থেকেও চলে যাচ্ছে অন্য আরও অনেকের কাছে।

এইসব ম্যাসেজের কোনো ভিত্তি পাওয়া যায় না কারো কাছে। খুঁজতে গেলে পৃথিবী সৃষ্টির রহস্যের মতো সবকিছু গুলিয়ে যায়। অর্থাৎ, শুরুতে কে পাঠালো তার আর হদিস মেলে না। কিন্তু চক্রাকারে এইসব ম্যাসেজ এখানে সেখানে যাচ্ছে । বুঝে অথবা না বুঝেই আমরা সাদরে তা গ্রহন করছি।
কোনোটা ধর্মীয়বাণী,কোনটা ডাক্তারী, কোনটা কবিরাজী, কোনোটি আবার রাজনৈতিক বাণী সমৃদ্ধ। সম্বলিত এমন ম্যাসেজ, যা ধর্মগ্রন্থ বা ধর্ম সংশ্লিষ্ট কোনো গ্রন্থে খুঁজেও পাওয়া যায় না। বড়ই হাস্যকর ও পরিতাপের বিষয় যে, ম্যাসেজের ভেতর এরকম কথা থাকে যে, এই ম্যাসেজ ফরোয়ার্ড না করলে দোযখের আগুনে পুড়তে হবে আর ফরোয়ার্ড করলে বেহেশত সুনিশ্চিত। কেউ কেউ এইসব তার জ্ঞানের অপরিপক্বতার কারণে বিশ্বাসও করে থাকে। অথচ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মীয় জ্ঞান না থাকলে এ ধরণের কথা বলা মস্ত বড় অন্যায়। আবার কোনো ম্যসেজে থাকছে রাজনৈতিক স¦ার্থ রক্ষার খুদেবার্তা। যা আদান-প্রদানে বিশৃঙ্খলারও সৃষ্টি হতে পারে সমাজে। অভিযোগ উঠলে আইনানুগভাবে হতে পারে কঠিন শাস্তিও।
কোনো কোনো ম্যাসেজ পাঠিয়ে দাবি করা হয়, তা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। অথচ প্রশাসন কোনো ব্যাপারে সতর্ক বার্তা দিলে প্রকাশ্যেই দিয়ে থাকে এবং যথেষ্ট প্রমাণ ও যুক্তি নিয়েই প্রশাসন কথা বলে। কিন্তু এইসব ম্যাসেজে সচেতনতার নামে বিভ্রান্তিই বেশী করে থাকে সবাইকে। আবার কখনো কোনো সুবিধাবাদী অসৎ লোক তাদের বাজে উদ্দেশ্য চরিতার্থের প্রয়াসে নিজেদের পণ্যকে সেরা হিসেবে জনপ্রিয় করতে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো পণ্যের নামে ভয়ানক বার্তা দিয়ে থাকে। এরকমও বলে থাকে, এসব পণ্য ব্যবাহারে মৃত্যুও হতে পারে।

কেমন ভাষা থাকে সেসব ম্যাসেজে, এরকম কিছু ম্যাসেজে উদাহরণ বা ধারণা তুলে ধরছি। যেমন আমরা বিভিন্ন ম্যাসেজে দেখতে পাই-
‘আচ্ছালামু আলাইকুম। আমরা আরাকানের নির্যাতিত মুসলিম রোহিঙ্গাদের শান্তি কামনায় সবাই সম্মিলিতভাবে ২৫০,০০০,০০০ বার দোয়ায়ে ইউনুছ পড়তে চাই, যেন মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর রহম করেন। অনুগ্রহ করে আপনি “লা-ইলাহা ইল্লা আন্তা ছুবহানাকা ইন্নি কুনতুম মিনাজ-জয়ালেমিন” এই দোয়াটি ১১ বার তেলাওয়াত করুন এবং আপনার সকল বন্ধুদের কাছে মেসেজ ফরোয়ার্ড করুন। আল্লাহ আমাকে আপনাকে এর বরকত দান করবেন। আমিন।
আবার কখনো লেখা থাকে- ‘আগামি কয়েক সপ্তাহ পর —– নামে কমল পানীয় জাতীয় কোনো জিনিস বাজারে পাওয়া যাবে সেই সব জিনিস খাবেন না! কারন এতে কেউ— মিশিয়ে দিয়েছে। এটা ভারতের ‘এন ডি’ টি ভি তে দেখানো হয়েছিল! দয়া করে সব বন্ধুদের শেয়ার করে একজন দায়িত্ববান নাগরিকের ভূমিকা পালন করুন। দয়া করে এটি পান করার আগে, তোমার বন্ধুদের সাহায্য করো এটি পাঠিয়ে দিয়ে। ১৬ কোটি বাংলাদেশীদের কাছে পৌঁছে দাও। এটি কাউকে সাহায্য করতে পারে। যতবেশি সম্ভব এটি এখনি করো। সময় না নিয়ে দ্রুত এটি পড় ও পাঠিয়ে দাও। আমেরিকান ডাক্তাররা মানুষের শরীরে এক নতুন ক্যান্সার খুঁজে পেয়েছেন। যখন তুমি মোবাইল কার্ড নোখ দিয়ে ঘসিয়ে তোলো তখন এটি তোমার শরীরে স্কিন ক্যান্সারের কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। এটি এখনি পাঠিয়ে দাও যাদের তুমি ভালোবাসো।
বাম কানে ফোনে কথা বলো। ঠান্ডা পানি দিয়ে ঔষধ খেও না। ৫টার পরে ভারী খাদ্য খেও না। রাতের চেয়ে দিনে পানি বেশি পান করো। ঘুমানোর উত্তম সময় হলো রাত ১০টা হতে ভোর ৪টা। ফোনের চার্জ যখন শেষ দাগে তখন কোনো কল ধরোনা এই সময় রেডুএশন অন্যান্য সময়ের চেয়ে ১০০০ গুন বেশি থাকে।
তুমি কি এটি তাদের পাঠাতে পারবে যাদের তুমি আদর,যতœ করো বা ভালোবাসো? আমি করেছি, উদারতা কিছু নয় কিন্তু জ্ঞান হলো শক্তি। আমেরিকান ক্যামিকাল রিসার্চ সেন্টার বলেছে, প্লাষ্টিকের কাপে চা খেওনা এবং পোলেথিন পেপার এ কোনো ফল খেওনা কারন এর দ্বারা ৫২ ধরনের ক্যান্সার হতে পারে। তাই এই সুন্দর একটি এস এম এস ১০০ খারাপ এস এম এস থেকে উত্তম। দয়াকরে এটি পাঠাও যাদের তুমি ভালো বাস।’
৯০% লোক এই মেসেজটি ফরওয়ার্ড করেছে আপনিও নিশ্চয়ই করবেন। কারণ আল্লাহর দিনের খবর দিতে দেরি করতে নেই। অবশ্য যে আল্লাহর কাজে লেগে যায় আল্লাহ নিজে তার কাজে লেগে যান। আর এই দিনের দাওয়াতের উসিলায় আল্লাহ আপনাকে কিয়ামতের দিন জান্নাত নসিব করবেন ইনশাল্লাহ।’
খুব গোপনে এক ইনবক্স থেকে আরেক ইনবক্সে আদান-প্রদানের ফলে সেভাবে সামনে আসে না এইসব বিভ্রান্তমূলক ম্যাসেজ। প্রজন্মের একটা বড় অংশই শুধু না প্রায় সব বয়সী মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনেক কথাই যাচাই বাছাই না করেই বিশ্বাস করে বসে। ফলে এক রকমের ভুল শিক্ষায় অন্ধের মতো পথ চলছে অনেকে। নিশ্চয়ই এই অন্ধত্বের ফল ভালো কিছু বয়ে আনবে না। সময় এসেছে এসব বিভ্রান্তিমূলক ম্যাসেজ নিয়ে ভাবতে বসা। কারণ, যখন যা ছড়াতে থাকে তা এক সময় স্থায়ী রূপ পেতেও দেরি হয় না। এর জন্য অবশ্য কুসংস্কারও কম দায়ী নয়। আর এই কুসংস্কার আর অন্ধবিশ^াসটা কিছু নাম ধারী শিক্ষিত ব্যক্তিরাই বেশী বিশ^াস করে থাকে। কিছুটা চিলে কান নেবার মত। নতুন প্রজন্ম এবং সচেতন মহল যদি এগুলোর প্রতিবাদ না করে,প্রযুক্তিগত জ্ঞান যদি কাজে না লাগায়,সর্তক না হয় তাহলে ডিজিটালাইজের পুরো ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হবে না। বরং উলেটা দেশের মধ্যে আইন শৃংখলার অবনতি ঘটার সম্ভাবনা রয়ে যায়।

লেখক- প্রভাষক মো.মাজেম আলী মলিন বিভাগীয় প্রধান (সমাজবিজ্ঞান বিভাগ) রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজ, সভাপতি গুরুদাসপুর মডেল প্রেসক্লাব,প্রকাশক ও সম্পাদক দৈনিক বনলতা, সাংবাদিক দৈনিক ভোরের কাগজ।

আপনার মতামত লিখুন :