আরবি পড়তে না যাওয়ায় শিশুকে শিকলে বেঁধে নির্যাতন

Md MagemMd Magem
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৪:০৪ PM, ১০ অক্টোবর ২০২০

 

বিশেষ প্রতিবেদ.  

বাজারে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল শিশুটি। পা ও আর কোমড়ে লোহার শিকলের একপ্রান্ত বাঁধা। শিকলের আরেক প্রান্ত খোলা। সবাই বুঝতে পারছিলেন, কোথাও থেকে পালিয়ে এসেছে শিশুটি। যেখানে তাকে হিংস্র প্রাণির মতো শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো।

কৌতুহলী হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা শিশুটির সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন সেই মর্মান্তিক ঘটনা। সুস্থ চঞ্চলমতি শিশুটি মাদ্রাসায় আরবি পড়তে গিয়ে শিকলে বেঁধে পড়ে। চঞ্চলমতি হওয়ায় মাঝে মাঝে নির্যাতনও করা হতো। যে কারণে তার চোখের নিচে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতে চিহ্ন রয়েছে। স্থানীয়রা খবর দেয় পুলিশে। তারা এসে শিশুটিকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।

ঘটনাটি ঘটেছে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের কদিমপাড়া বুড়া দেওয়ান নূরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসায়। সেখানকার নূরানী বিভাগে পড়ে শিশুটি। নাম তার মোবারক (১১)। নাটোরের আটঘরিয়া উপজেলার চাঁদভা ইউনিয়নের বাঁচামরা গ্রামের নজরুল ইসলাম ও মূর্শিদা খাতুনের ছেলে।

‘অবাধ্য’ হওয়ার কারণে শিশু মোবারককে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো বলে স্বীকার করেছেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আব্দুল করিম। পুলিশ পরে ওই অধ্যক্ষসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

উদ্ধার হওয়া শিশুটির বরাতে ঈশ্বরদী থানার পুলিশ জানায়, অধ্যক্ষ আব্দুল করিম শিশুশিক্ষার্থী মোবারকে গেল বুধবার থেকে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিলেন। মাদ্রাসার নির্দিষ্ট একটি কক্ষ থেকে বের হতে দিতেন না। তিনদিন এভাবে থাকার পর শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দুপুরে পালিয়ে এসে কদিমপাড়া এলাকার একটি দোকানের বারান্দায় এসে আশ্রয় নেয় মোবারক।

স্থানীয় লোকজন সেখানে তাকে কাঁদতে দেখে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে শিশুটিকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। শিশুটির কাছ থেকে সবকিছু শোনার পর রাতেই অধ্যক্ষসহ তিনজনকে আটক করে পুলিশ। খবর পেয়ে মূর্শিদা খাতুন থানায় এসে ছেলেকে বাসায় নিয়ে যান।

মূর্শিদা খাতুন জানান, ছেলেকে আরবি শেখানোর জন্য মাদ্রাসায় দিয়েছিলেন। তবে ছেলে মাদ্রাসায় থাকতে চাইতো না। মাদ্রাসায় মন বসতো না। তাই বলে শিক্ষকেরা ছেলেকে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিলেন, এটা তিনি জানতেন না।

শিশুর বাবা নজরুল ইসলাম ছেলের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন, তাকে তিনদিন ধরে বেঁধে রাখা হয়েছিল। তার সঙ্গে যখন ছেলের কথা হয় তখন তিনি দেখেন তার ছেলের চোখের নিচে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন।

এদিকে অধ্যক্ষ আব্দুল করিম আরো জানান, তিনি ছুটিতে গিয়েছিলেন। শিক্ষার্থীদের দেখভালের দায়িত্ব ছিলো শিক্ষক পিয়ারুল ইসলামের ওপর। শিক্ষক পিয়ারুল এ ব্যাপারে জানান, শিশুটি অবাধ্য ছিল। সে পড়ালেখা ফাঁকি দিতে প্রায়ই মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে বাড়ি চলে যেত। তাই তার দাদির নির্দেশে তাকে আটকে রাখা হয়েছিল।

এ বিষয়ে ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফিরোজ কবির জানান, আটক তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঈশ্বরদী উপজেলা মানবাধিকার সমিতি এবং ইপিডি প্রকল্পের প্রকল্প কর্মকর্তা সানোয়ার হোসেনে বলেন, নির্যাতনের এই ঘটনা নির্মম। শিশুরা ভুল করতে পারে। তাদের নির্যাতন নয়, শোধরানোর জন্য স্নেহ ও ভালোবাসা দিতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন :