হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান ও দেহরক্ষীর ১ বছর করে কারাদণ্ড

বনলতা নিউজ ডেস্ক.বনলতা নিউজ ডেস্ক.
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৬:২৮ AM, ২৭ অক্টোবর ২০২০

বনলতা ডেস্ক.
নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফকে মারধরের ঘটনায় মামলা দায়ের
অবৈধ অস্ত্র ,মদ্যপান ও ওয়াকিটকি ব্যবহার করায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিম এবং তার দেহরক্ষী মোহাম্মদ জাহিদকে ১ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল সোমবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা নাগাদ পুরান ঢাকার সোয়ারিঘাটে হাজী সেলিমের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ওই দুজনকে গ্রেফতারের পর এই দণ্ড দেয়া হয়।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক আশিক বিল্লাহ বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই দণ্ডের পাশাপাশি দু’জনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে দুটি মামলা দায়ের করা হবে। গত রোববার রাতে নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমেদ খানকে মারধর ও হত্যার হুমকির অভিযোগে দায়ের করা মামলার জের ধরে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে সোয়ারিঘাটের দেবদাস লেনে হাজী সেলিমের বাড়ি ঘেরাও করে অভিযান শুরু করে র‌্যাব। অভিযানে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমও উপস্থিত ছিলেন। সাদা রঙের নয় তলা ওই ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় ইরফান সেলিম থাকেন জানিয়ে বিকেলে ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার বলেন, ওই দুই ফ্লোর

থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, গুলি, একটি এয়ারগান, ৩৮টি ওয়াকিটকি, পাঁচটি ভিপিএস সেট, একটি পিস্তল, একটি একনলা বন্দুক, একটি ব্রিফকেস, একটি হ্যান্ডকাফ, একটি ড্রোন এবং সাত বোতল বিদেশি মদ ও বিয়ার উদ্ধার করা হয়েছে।

তবে আগ্নেয়াস্ত্রের কোনো লাইসেন্স নেই। আর ওয়াকিটকিগুলোও অবৈধ, কালো রঙের এসব ওয়াকিটকি শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করতে পারেন। মদ্যপান ও ওয়াকিটকি ব্যবহার করার অপরাধে ইরফান ও তার দেহরক্ষীকে ছয় মাস করে এক বছরের কারাদ- দেয়া হয়েছে বলে আশিক বিল্লাহ জানান। র?্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে এসব উদ্ধার করা হয়।

র?্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে এরফান সেলিম জানিয়েছেন, এসব ওয়াকিটকির মাধ্যমে তিনি তার বাসার আশপাশের পাঁচ থেকে ৪ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা নেতাকর্মী ও অনুসারীদের সঙ্গে কথাবার্তা এবং যোগাযোগ রাখতেন। র?্যাব জানিয়েছে, উদ্ধার ভিপিএস সেটগুলোকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ডিটেক করতে পারত না। তার বাসার চার ও পাঁচ তলার কন্ট্রোল রুম থেকে এসব উদ্ধার করা হয়।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, এসব অস্ত্র ও হ্যান্ডকাফের বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এরফান সেলিম। আমাদের ধারণা এগুলো দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখাতেন। তার অস্ত্র দুটির কোনো লাইসেন্স ছিল না।

জানা গেছে, নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমেদ খানকে মারধর ও হত্যার হুমকির অভিযোগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের ছেলে মোহাম্মদ এরফান সেলিমের বিরুদ্ধে করা মামলায় এরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষী মোহাম্মদ জাহিদকে র‌্যাব হেফাজতে নিয়েছে। তবে হাজী সেলিমের গাড়িচালক মিজানুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গাড়িচালক মিজানুর রহমানকে একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

এর আগে গত রোববার রাতে এমপি হাজী মোহাম্মদ সেলিমের ‘সংসদ সদস্য’ লেখা সরকারি গাড়ি থেকে নেমে নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমেদ খানকে মারধর করা হয়। রাজধানীর কলাবাগান সিগন্যালের পাশে এ ঘটনা ঘটে। রাতে এ ঘটনায় জিডি হলেও গতকাল সোমবার ভোরে হাজী সেলিমের ছেলেসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলায় আসামিরা হলেন- হাজী সেলিমের ছেলে মোহাম্মদ এরফান সেলিম, প্রোটকল অফিসার এবি সিদ্দিক দিপু, মোহাম্মদ জাহিদ ও মিজানুর রহমানের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত পরিচয় আরো তিনজনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ গত রোববার রাত পৌনে ৮টার দিকে স্ত্রীকে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে কলাবাগানের দিকে যাচ্ছিলেন। ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে সংসদ সদস্যের স্টিকার লাগানো একটি কালো রঙের ল্যান্ড রোভার গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১১- ৫৭৩৬) পেছন থেকে তার মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়।

ওয়াসিফ ও তার স্ত্রী ধাক্কা সামলে মোটরসাইকেল থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে ওই গাড়ি থেকে জাহিদ, দিপু এবং অজ্ঞাত পরিচয় আরো দুই-তিনজন ‘অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ’ করতে করতে নেমে আসে। এ সময় ওয়াসিফ নিজের পরিচয় দেন। তখন গাড়ি থেকে আসামিরা একসঙ্গে বলতে থাকেন, তোর নৌবাহিনী/ সেনাবাহিনী বের করতেছি, তোর লেফটেন্যান্ট/ ক্যাপ্টেন বের করতেছি। তোকে এখনি মেরে ফেলব বলে কিল-ঘুষি মারেন এবং ওয়াসিফকের স্ত্রীকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে। তারা ওয়াসিফকে মারধর করে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে যায়। পরে তার স্ত্রী, স্থানীয় জনতা এবং পাশে ডিউটিরত ধানমন্ডি থানার ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে উদ্ধার করে আনোয়ার খান মডেল হাসপাতালে নিয়ে যায়।

মামলায় মোট পাঁচটি ফৌজদারি অপরাধের ধারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অপরাধগুলো হলো- দ-বিধি ১৪৩ অনুযায়ী বেআইনি সমাবেশের সদস্য হয়ে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধমূলকভাবে বলপ্রয়োগ করা, ৩৪১ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে অবৈধভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, ৩৩২ ধারা অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তার কাজে বাধাদানের উদ্দেশ্যে আহত করা, ৩৫৩ ধারা অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তার ওপর বলপ্রয়োগ করা এবং ৫০৬ ধারায় প্রাণনাশের হুমকি দেয়ার।

অপরদিকে নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমেদ খানকে মারধরের ঘটনায় ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের গাড়িচালক মিজানুর রহমানকে ১ দিনের রিমান্ডে নেয়ার আদেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল সোমবার ঢাকা মহানগর হাকিম আবু সুফিয়ান মোহাম্মদ নোমানের আদালত এই আদেশ দেন। এর আগে আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাকে ৫ দিনের রিমান্ডের নেয়ার জন্য আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তার ১ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, সোয়ারিঘাট এলাকায় হাজী সেলিমের একটি বাড়ি আছে, সেটা ঘেরাও করে র‌্যাব সদস্যরা অভিযান চালায়।

চকবাজার থানার ওসি মওদুদ হাওলাদার বলেন, হাজী সেলিমের বাসায় র‌্যাব ও ডিবির যৌথ অভিযান চালায়। চকবাজারের যে বাসায় র‌্যাব অভিযান চালিয়েছে সেটি হাজী সেলিমের পৈতৃক বাড়ি। অভিযানে র‌্যাবের ৪০০-৫০০ সদস্য অংশ নিয়েছেন। ওই এলাকায় কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।

এ বিষয়ে ধানমন্ডি থানার ওসি ইকরাম আলী মিয়া বলেন, ওই গাড়িটি সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের। ঘটনার সময় তিনি গাড়িতে ছিলেন না। তার ছেলে এরফান সেলিম, নিরাপত্তারক্ষীসহ ৫-৬ জন ছিলেন। এ ঘটনায় এরফান সেলিমকে প্রধান আসামি করে একটি মামলা করেছেন লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ।

রমনার ডিসি সাজ্জাদুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় এ পর্যন্ত একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত সব আসামিকে ধরতে অভিযান চলছে। এছাড়াও ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

আপনার মতামত লিখুন :