চলনবিলে শ্রমিকের হাট-করোনায় বেড়েছে শ্রমিকের কদর

বনলতা নিউজ ডেস্ক.বনলতা নিউজ ডেস্ক.
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৩:৪৮ AM, ২২ নভেম্বর ২০২০

প্রভাষক মো. মাজেম আলী মলিন.
সুর্যদয় হয়নী তখনও। শীত আর ঘন কুয়াশাকে উপেক্ষা করে দুরদুরান্ত থেকে হাজারো শ্রমিক আসছে প্রতিদিন ট্রাক,বাস,লসিমন,করিমনে। কৃষিকাজের প্রয়োজনীয় উপকরন-কাস্তে,কোদাল,মাথালসহ বিভিন্ন প্রকার নিড়ানী যন্ত্র হাতে নিয়ে নারী-পুরুষ,বৃদ্ধ,যুবক অসংখ্য কাজের মানুষ আসছেন এই শ্রমিকের হাটে। তবে কোন কেনা-কাটা নয়, এসেছেন শ্রম বিক্রি করতে।
দিন বদলের সাথে পাল্লা দিয়েই পুরুষের পাশাপাশি বাড়ছে নারী শ্রমিকের সংখ্যাও। জীবনে হার না মানা এসব নারী শ্রমিকেরা পুরুষের সাথে কাধে কাধ, হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছেন দিন রাত । বাসা-বাড়ী, মাঠ- ঘাট, এমনকি ফসলের জমিতেও। যেন একচিলতেদম ফেলানোর ফুসরত নেই তাদের । এগিয়ে যাবার সাহসী দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে কাজ করছেন দেশ থেকে দেশান্তরে নিজেদের জীবন চালানোর তাগিদেই।

সরেজমিনে গিযে দেখাযায়- নাটোরের গুরুদাসপুরের নয়াবাজার,হাজীরহাট,ভিটাবাজার এবং বড়াইগ্রাম উপজেলার মানিকপুর,রওশনপুর, রাজ্জাকমোড় ও থানারমোড় সিরাজগঞ্জের তাড়াশসহ বিভিন্ন জায়গায় বসচ্ছে এ সকল শ্রমিকের হাট। ভোর ৫টা থেকে শুরু হয়ে চলে সকাল ৮টা পর্যন্ত এই শ্রমিক ক্রয়-বিক্রয়ের আনুষ্ঠানিকতা। ধানকাটা,চারারোপন,আলু,পিঁয়াজ রসুন লাগানোসহ নানাবিধ কাজ করার উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসচ্ছেন এ সকল শ্রমিক রোজগাড়ের জন্য। হিন্দু,মুসলিম,ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর নারী-শ্রমিকও রয়েছেন এই দলে।

শ্রমিকের এই হাটে শ্রম বিক্রি করতে আসা অনিমা ওরাঁও জানান, সিরাজগঞ্জের মেরিগাছা গ্রাম থেকে কুড়ি টাকা ভাড়ায় ট্রাকে চলে এসেছেন গুরুদাসপুরে ‘নয়া বাজারে’ শ্রম বিক্রি করতে। সিংড়ার বড়িয়া থেকে আসা চন্দ্রিমা রানী জানান, তাদের এলাকা অপেক্ষাকৃত নিচু। সেখানে ইরি-বোরো আবাদ ছাড়া চলতি মৌসুমে কোনো কাজ নেই। তাই গুরুদাসপুরে রসুন রোপণ, ধানকাটাসহ সকল কাজ করতে এসেছেন। এই দলের সঙ্গে আসা কলেজ ছাত্রী মায়া টক্কি জানান, গত বছরের চেয়ে এবার শ্রমিকের মুল্য একটু বেশী পেলেও পুরুষ শ্রমিকদের চাহিদা এখনো বেশী। অথচ কাজ পুরুষের তুলনায় কম করিনা ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কঠোর পরিশ্রমী, সহজ-সরল আর অপেক্ষাকৃত কম দামে শ্রমিক পাওয়ায় এ অঞ্চলে নারী শ্রমিকদের চাহিদা অনেক বেশি। কম মজুরিতে কৃষি শ্রম বিক্রি করেই তাদের সংসার পরিচালনা করতে হয়। চলনবিলের বিভিন্ন মাঠে ময়দানে কাজ করতে আসা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী শ্রমিক শ্যামলী রানী ও কুমারী আল্পনা রানী জানায়, সকাল ৮ থেকে ৪টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন শ্রম দিয়ে তারা মজুরি নিজের খেয়ে পাচ্ছেন ৩শ টাকা থেকে ৩শ৫০ টাকা। তাতে কোনো রকমে চলে যাচ্ছে তাদের সংসার। আর পুরুষ শ্রমিকরা পাছেন ৩শ৫০ থেকে ৪শ টাকা মজুরী।
গতকাল রোববার নয়াবাজারের শ্রমিকের হাটে গিয়ে দেখা যায়, গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম ছাড়াও তাড়াশ, সলঙ্গা, উল্লাাপাড়া, বগুড়া শেরপুর উপজেলা এলাকার শ্রমিকরা দল বেঁধে এখানে জমায়েত হয়েছে। সকলের গায়েই রয়েছে শীতের পোশাক, হাতে কাজ করার উপকরন। কৃষক তাদের চাহিদামতো শ্রমিক দরদাম মিটিয়ে সরাসরি ভ্যান যোগে নিয়ে যাচ্ছেন মাঠে। আব্দুল মতিনসহ পাঁচজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধান কাটা, বিনা হালে রসুন রোপণ, সেখানে নাড়া (ধানের খড়) বিছানোসহ জমি তৈরির কাজ করানো হয় এসব শ্রমিককে দিয়ে। এবছর করোনার কারনে শ্রমিক সংকট দেখা দেওয়ায় শ্রমিকের মজুরী একটু বেশী। তার পরেও কাজ করার স্বার্থে বেশী মুল্যেও শ্রমিক নিতে হচ্ছে।

নাটোর কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুব্রত কুমার সরকার বলেন, চলনবিলে এখন কাজের মৌসুম চলছে। একদিকে করোনাকাল চলছে সেই কারনে শ্রমিকের স্বল্পতা রয়েছে। তবুও নি¤œ আয়ের মানুষ তাদের প্রয়োজনের তাগিদেই কাজ করছে। তবে শ্রমিকদের মজুরী বিষয়ে তিনি জানান দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধির কারনে তারা জীবন চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। কৃষকদের সাময়িক সমস্যা হলেও ফসলের ন্যায্য দাম পেলে কোন সমস্যা হবেনা বলে তিনি জানান।

আপনার মতামত লিখুন :