কামিল ও ফাজিল শিক্ষকেরা বেতন ভুক্ত কিন্তু অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদের কি দোষ?

বনলতা নিউজ ডেস্ক.বনলতা নিউজ ডেস্ক.
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৪:৪০ PM, ২২ ডিসেম্বর ২০২০

বিশেষ প্রতিনিধি.
দেশের উচ্চশিক্ষা গ্রাম অঞ্চলের গরীব ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বেসরকারি কলেজ গুলোতে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স চালু করা হয় । কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বিগত বিএনপি সরকারের ভ্রান্ত জনবল কাঠামো নীতিমালা ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরদর্শীতার কারণে যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই কোর্স চালু করা হয় তা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয় নি। এর মূল কারণ হলো অনার্স-মাস্টার্স কোর্সে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের “জনবল কাঠামো/ সরকারি নীতিমালাতে ” অন্তর্ভুক্ত না করা ।

দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকেরা বেতন বঞ্চনার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শুধু মাত্র জনবল কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার কারণে শিক্ষকেরা বছরের পর বছর ধরে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে । সংশোনাধীন জনবল কাঠামো সংশোধন কমিটির প্রথম মিটিংয়ে সকল সদস্য বেসরকারি অনার্স মাস্টার্স স্তরের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে সর্ব সম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও কোন এক অদৃশ্য কারণে তা স্থগিত রাখা হয় । বর্তমান করোনা মহামারীর তান্ডবে উচ্চশিক্ষায় নিয়োজিত অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদের জীবন জীবিকা আজ কঠিন সমীকরণে।

উল্লেখ্য যে,১৯৯৫,২০১০,২০১৩ এবং ২০১৮ তে জনবল কাঠামো সংশোধন করা হলেও এসব শিক্ষকদের দাবি সমসময় উপেক্ষা করা হয়েছে। তারপরেও দীর্ঘ আটাশ বৎসর হলো শিক্ষকেরা প্রতিষ্ঠান থেকে নামমাত্র বেতনে কিংবা বেতনহীন অবস্হায় লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদান করে আসছেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি বিধি মোতাবেক এই সকল শিক্ষক নিয়োগ প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। বিধি মোতাবেক একজন শিক্ষকের নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয় এবং নিয়োগ ও মৌখিক পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ও ডিজি মহোদয়ের প্রতিনিধির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ চূড়ান্ত হয়।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ নীতিমালা ও সরকারি বিধি মোতাবেক নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের শতভাগ বেতন -ভাতা ও সুযোগ সুবিধা প্রদানের নির্দেশনা থাকলেও সারাদেশে মোট বেসরকারি কলেজের ৯০% কলেজ কর্তৃপক্ষ তা আমলে নিতে চায় না। জানা গেছে,শিক্ষকদের বেতনের নাম করে গরীব ছাত্রছাত্রীদের নিকট হতে মাসে ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা করে বেতন নেওয়া হলেও শিক্ষকদের বেতন বাবদ ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে দিয়ে থাকে যা একজন শিক্ষকের বর্তমান বাজার দরে জীবন জীবিকা নির্বাহ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই নয় অধিকাংশ কলেজেই মাসের পর মাস সামান্য যে টাকা দেয় তা কলেজ ফান্ডে অর্থ না থাকার অযুহাতে বন্ধ রাখে।

শুরুতে কলেজের সংখ্যা গুটি কয়েক হলেও ২০১৮ সাল পর্যন্ত তা ৫০০ ছাড়িয়ে যায় । ২০১৮ সালে বেসরকারি কলেজ গুলো জাতীয়করণ করার পর বতর্মানে অনার্স-মাস্টার্স পাঠদানরত কলেজের সংখ্যা ৩১৫ টি । দীর্ঘ আটাশ বৎসরের বঞ্চনার এই দাবী আদায়ে শিক্ষকেরা বিভিন্ন সময় সভা, সমাবেশ, মানবন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করে। এর প্রেক্ষিতে অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদের জনবল কাঠামো ও এমপিওভুক্ত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে বিগত দিনে তিন টি নিদর্শনা প্রদান করা হয়, শিক্ষা অধিদপ্তর সাবেক দুজন মহাপরিচালক মহোদয় দুটি সুপারিশ করেন এবং শিক্ষা মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দুটি করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় নি।

আমরা চাই ২৮ বছরের বঞ্চনার অবসান হোক, বেসরকারি অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদের ন্যায্য এমপিও দাবি সরকার খুব দ্রুত মেনে নিয়ে উক্ত সমস্যা সমাধানে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

বেসরকারী অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকেরা যে যে কারণে এমপিও পাওয়ার দাবি রাখে-

১। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির জন্য বিগত তিনটি নির্দেশনা রয়েছে, যা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয় নি । উক্ত নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা অতীব জরুরী।

২। একই বিধি ও নিয়মে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে জাতীয়করণকৃত ৪৫ টি কলেজের অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকেরা ক্যাডার ভুক্ত হয়েছেন, এছাড়া আরো ২৯৩ টি কলেজের অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকেরা নন ক্যাডার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে তাই বেসরকারি কলেজের শিক্ষকেরা এমপিওভুক্তির দাবি রাখে।

৩। মাদ্রাসা পর্যায়ে কামিল ও ফাজিল শিক্ষকেরা এমপিওভুক্ত হতে পারে তাহলে বেসরকারি কলেজের অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকেরা অবশ্যই এমপিওভুক্তির দাবি রাখে।

৪। উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর রয়েছে অথচ উচ্চশিক্ষা স্তরে নিয়োজিত বেসরকারি অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদের কোন জনবল কাঠামো বা সরকারি নীতিমালা নেই, তাই বেসরকারি অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদের জনবল কাঠামো প্রণয়ন অপরিহার্য ।

৫। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত একই এমপিওভুক্ত কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ও ডিগ্রি শিক্ষকেরা এমপিওভুক্ত হতে পারলে অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদেরও অবশ্যই এমপিওভুক্ত করতে হবে।

৬৷ জাতীয় শিক্ষানীতি – ২০১০ এর উচ্চশিক্ষা অধ্যায়ে তিন বছরের ডিগ্রি কোর্স পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন করে চার বছরের সম্মান কোর্স শিক্ষা সমাপনী ডিগ্রি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছিল, কারণ সরকারি সকল চাকরি ক্ষেত্রে এখন চার বছরের সম্মান কোর্স চাওয়া হয় কিন্তু এখন পর্যন্ত এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হয় নি। তাই অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদের জনবল কাঠামো ও এমপিওভুক্ত অবশ্যক।

৭। জাতীয় সংসদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দুটি সুপারিশে বেসরকারি অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদের জনবল কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করে এমপিওভুক্তির সুপারিশ করা হয় যা এখনও পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয় নি, তাই অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদের জনবল কাঠামো ও এমপিওভুক্তি করা অত্যন্ত জরুরী।

৮। শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক দুজন মহাপরিচালক অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদের জনবল কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করে এমপিওভুক্তির জন্য শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে দুটি সুপারিশ করে যা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হয় নি। তাই বঞ্চিত অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদের জনবল কাঠামো ও এমপিওভুক্তি করা অত্যন্ত জরুরী।

৯। এমপিও না দেওয়া শর্তে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার অনুমতি দেওয়ার পরেও যদি হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান এমপিও পায় তবে অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকেরা কেন এমপিও বঞ্চিত থাকবে। তাদের দ্রুত জনবল কাঠামো ও এমপিও দেওয়া উচিত।

১০| সংশোধনাধীন জনবল কাঠামোরসকল সদস্য অনার্স মাস্টার্স স্তর নীতিমালাতেঅন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও কেন এসকল শিক্ষকেরা সরকারি জনবল কাঠামো ও এমপিও বঞ্চিত থাকবে।

বঞ্চনার এই কারণ সমূহ বিশ্লেষণ করে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, বেসরকারি অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত অতীব জরুরী । এছাড়া চলমান করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষকেরা অত্যন্ত কষ্টে দিন অতিবাহিত করছে । তাই উচ্চ শিক্ষাদানে নিয়োজিত এই সকল শিক্ষকের হৃদয়ের বোবা কান্না উপলব্ধি করে তাদের কে অনতিবিলম্বে সংশোনাধীন জনবল কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করে এমপিও প্রদান এখন সময়ের দাবি। আমাদের মমতাময়ী মা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা উপমন্ত্রী ও শিক্ষা সচিব সহ সরকারের নীতি নির্ধারকগণের নিকট আমাদের আকূল আবেদন বঞ্চনার এই দাবি দীর্ঘায়িত না করে অসহায় শিক্ষকদের কথা চিন্তা করে সংশোনাধীন জনবল কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করে অতি দ্রুত এমপিও ঘোষণা দিবেন ।

আপনার মতামত লিখুন :