বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

অভিযানেও বন্ধ হচ্ছে না বেড়া-সাঁথিয়ায় চায়না দোয়ারের উৎপাদন!

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৫:১৭:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
  • ২১ Time View

হারুনার রশীদ (হারুন) বেড়া(পাবনা) থেকে.

দেশি মাছের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ‘চায়না দোয়ার’ নামের এক ধরনের জাল ইতিমধ্যেই কুখ্যাতি অর্জন করেছে। কারো কারো মতে এই জাল কারেন্ট জালের চেয়েও ভয়ঙ্কর। এক সময় এই জাল চীনে ও পরে ঢাকার কারখানায় তৈরি হলেও এখন এটি পাবনার বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলাতেই ব্যাপকভাবে তৈরি হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়েও বন্ধ করা যাচ্ছে না এই জালের উৎপাদন।

এদিকে ‘চায়না দোয়ারের’ দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে মাছ ধরার অন্যতম উপকরণ বাঁশের চাঁই বা দেশি দোয়ার। এদিকে গত ২৮ আগস্ট থেকে দেশে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ শুরু হয়েছে। মৎস্য সপ্তাহ চলাকালেও এই ধরনের জালের উৎপাদন ও বিক্রি থেমে নেই। এ ছাড়া চায়না দোয়ারের কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার উপকরণ বাঁশের চাঁই বা দেশি দোয়ার।

চায়না দোয়ার নামের জালটি বেড়া উপজেলাসহ সারা দেশে অনেকটাই নতুন। বছর দুয়েক হলো এই ধরনের জাল দিয়ে দেশে মাছ ধরা শুরু হয়েছে। শুরুতে চীন থেকে আমদানি করার কারণে এর নাম দেওয়া হয় চায়না দোয়ার। তবে এখন এই ধরনের জাল দেশেই তৈরি হচ্ছে। মূল কারখানায় সূক্ষ জাল তৈরি করার পর তা স্থানীয় পর্যায়ের কারখানায় নিয়ে এসে মাছ ধরার উপযোগী করা হয়। এ জন্য মূল কারখানা থেকে সংগ্রহ করা জাল স্থানীয় কারখানায় এনে তাতে গোলাকৃতি বা চারকোণার লোহার রড পড়িয়ে খোপ খোপ করে বিশেষ ধরনের ফাঁদ তৈরি করা হয়। এই ফাঁদ উচ্চতায় দেড় থেকে দুই ফুট এবং লম্বায় ৫০ থেকে ৮০ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে।

চায়না দোয়ার জালের বৈশিষ্ট্য হলো এ জাল নদীর তলদেশে লম্বালম্বি ভাবে লেগে থাকে। কোনো প্রকার খাদ্য ছাড়াই বিভিন্ন প্রজাতির মাছ দুদিক দিয়েই এই জালের মধ্যে ঢুকে পড়ে। বড় মাছ থেকে শুরু করে পোনা মাছ এমনকি মাছের ডিমও এই জালে সহজেই আটকে যায়। ফলে এই জালে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ দ্রæত বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বেড়া উপজেলার চরপাড়া, সোনাপদ্মা; আমিনপুর থানার বাঘুলপুর; সাঁথিয়া উপজেলার আতাইকুলা, ডেমড়াসহ বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলায় অন্তত ১০টি স্থানে এ ধরনের জালের কারখানা গড়ে উঠেছে। গত ৯ জুলাই বেড়া পৌর এলাকার চরপাড়া মহল্লার বিশ্বজিৎ হালাদারের বাড়ির কারখানায় বেড়া উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে প্রচুর ‘চায়না দোয়ার’ জাল উদ্ধার করে পুড়িয়ে দেয়। অভিযানের পর কিছুদিন বন্ধ থাকার পর ওই কারখানায় আবারও উৎপাদন শুরু হয়েছে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে। তবে এ প্রতিবেদকের উপস্থিতি টের পেয়ে দৌড়ে পালায় জাল তৈরীর কারিগররা।

এদিকে ‘চায়না দোয়ারের’ দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে মাছ ধরার অন্যতম উপকরণ বাঁশের চাঁই বা দেশি দোয়ার। বাঁশের চাঁইয়ের তুলনায় চায়না দোয়ারে কয়েকগুণ বেশি মাছ পাওয়া যায় বলে পেশাদার ও সৌখিন মাছ শিকারীরা চাঁইয়ের পরিবর্তে চায়না দোয়ার কিনতে ঝুঁকে পড়ছেন। এর ফলে বাজারে চাঁইয়ের চাহিদা ব্যাপক কমে গেছে।

পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার সবচেয়ে বড় চাঁই বিক্রির বাজার বেড়া উপজেলার পাটপট্টিতে অবস্থিত। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আগের বছরগুলোর তুলনায় বাজারে চাঁইয়ের সরবরাহ একেবারেই কম। কিন্তু বর্ষার শুরুতে চাঁই বিক্রির ধুম পরেছিল। এ নিয়ে প্রতিদিনের সংবাদে ‘‘ বেড়ায় জমে উঠেছে ‘চাঁই’ কেনা-বেচা ’’ শিরোনামে একটি সচিত্রে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। বর্ষার শুরুর দিকে কেনা-বেচা জমে উঠলেও এখন অর্থেকে নেমে এসেছে চাঁই এর কেনা-বেচা। এর কারন চায়না দোয়ার যাহাতে মাছ ধরা পরে বেশি।

চাঁই বিক্রি করতে আসা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সেলন্দা গ্রামের রজব আলী জানান, ৩০ বছর ধরে চাঁই বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। কিন্তু চায়না দোয়ারের কারণে বাজারে চাঁই আর চলছে না। এ বছরই চায়না দোযার বেশি চলছে। তবে বাঁশের তৈরী চাঁইএ ছোট মাছ ধরা পরে না বলে তিনি জানান।

এদিকে ঘুরে দেখা গেছে, দুই উপজেলার বিভিন্ন বাজারে অবাধে এই চায়না দোয়ার বিক্রি হচ্ছে। শুরুতে চীন থেকে সরাসরি আমদানি করার সময় এই জাল আকার ভেদে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হত। এখন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হওয়ায় ৫২ হাত দৈর্ঘ্যরে এই জালের দাম দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায় নেমে এসেছে।
বেড়া পৌর এলাকার চরপাড়া মহল্লার বিশ্বজিৎ হালদার ও নতুনভারেঙ্গা ইউনিয়নের সোনাপদ্মা গ্রামের সুচিত্র হালদারের বাড়িতে কারখানা বসিয়ে ‘চায়না দোয়ার’ জাল তৈরির অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিনে ওই দুটি স্থানে গিয়ে জাল তৈরির আলামতও দেখা গেছে। তবে তাঁরা দাবি করেন, না জেনে এক সময় এ ধরনের জাল তৈরি করলেও এখন আর তাঁরা তা আর করেন না। তবে বেড়া ও সাঁথিয়ার অনেক জায়গাতেই এ ধরনের জাল তৈরি হচ্ছে বলে তাঁরা জানান।

বেড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাহাদৎ হোসেন বলেন, ‘এই ধরনের জাল (চায়না দোয়ার) আমাদের এদিকে অনেকটাই নতুন। কারেন্ট জাল তৈরিতে ব্যবহৃত প্রায় একই উপাদান দিয়ে এ ধরনের জাল তৈরি হয় বলে এটা মাছ ও পরিবেশ উভয়ের জন্যই এটা হুমকিস্বরূপ। বেড়ায় এ ধরনের জালের কারখানায় আগেও অভিযান হয়েছে। অতি দ্বার দ্রুত অভিযান চালানো হবে।

Tag :
Popular Post

অভিযানেও বন্ধ হচ্ছে না বেড়া-সাঁথিয়ায় চায়না দোয়ারের উৎপাদন!

Update Time : ০৫:১৭:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২১

হারুনার রশীদ (হারুন) বেড়া(পাবনা) থেকে.

দেশি মাছের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ‘চায়না দোয়ার’ নামের এক ধরনের জাল ইতিমধ্যেই কুখ্যাতি অর্জন করেছে। কারো কারো মতে এই জাল কারেন্ট জালের চেয়েও ভয়ঙ্কর। এক সময় এই জাল চীনে ও পরে ঢাকার কারখানায় তৈরি হলেও এখন এটি পাবনার বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলাতেই ব্যাপকভাবে তৈরি হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়েও বন্ধ করা যাচ্ছে না এই জালের উৎপাদন।

এদিকে ‘চায়না দোয়ারের’ দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে মাছ ধরার অন্যতম উপকরণ বাঁশের চাঁই বা দেশি দোয়ার। এদিকে গত ২৮ আগস্ট থেকে দেশে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ শুরু হয়েছে। মৎস্য সপ্তাহ চলাকালেও এই ধরনের জালের উৎপাদন ও বিক্রি থেমে নেই। এ ছাড়া চায়না দোয়ারের কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার উপকরণ বাঁশের চাঁই বা দেশি দোয়ার।

চায়না দোয়ার নামের জালটি বেড়া উপজেলাসহ সারা দেশে অনেকটাই নতুন। বছর দুয়েক হলো এই ধরনের জাল দিয়ে দেশে মাছ ধরা শুরু হয়েছে। শুরুতে চীন থেকে আমদানি করার কারণে এর নাম দেওয়া হয় চায়না দোয়ার। তবে এখন এই ধরনের জাল দেশেই তৈরি হচ্ছে। মূল কারখানায় সূক্ষ জাল তৈরি করার পর তা স্থানীয় পর্যায়ের কারখানায় নিয়ে এসে মাছ ধরার উপযোগী করা হয়। এ জন্য মূল কারখানা থেকে সংগ্রহ করা জাল স্থানীয় কারখানায় এনে তাতে গোলাকৃতি বা চারকোণার লোহার রড পড়িয়ে খোপ খোপ করে বিশেষ ধরনের ফাঁদ তৈরি করা হয়। এই ফাঁদ উচ্চতায় দেড় থেকে দুই ফুট এবং লম্বায় ৫০ থেকে ৮০ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে।

চায়না দোয়ার জালের বৈশিষ্ট্য হলো এ জাল নদীর তলদেশে লম্বালম্বি ভাবে লেগে থাকে। কোনো প্রকার খাদ্য ছাড়াই বিভিন্ন প্রজাতির মাছ দুদিক দিয়েই এই জালের মধ্যে ঢুকে পড়ে। বড় মাছ থেকে শুরু করে পোনা মাছ এমনকি মাছের ডিমও এই জালে সহজেই আটকে যায়। ফলে এই জালে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ দ্রæত বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বেড়া উপজেলার চরপাড়া, সোনাপদ্মা; আমিনপুর থানার বাঘুলপুর; সাঁথিয়া উপজেলার আতাইকুলা, ডেমড়াসহ বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলায় অন্তত ১০টি স্থানে এ ধরনের জালের কারখানা গড়ে উঠেছে। গত ৯ জুলাই বেড়া পৌর এলাকার চরপাড়া মহল্লার বিশ্বজিৎ হালাদারের বাড়ির কারখানায় বেড়া উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে প্রচুর ‘চায়না দোয়ার’ জাল উদ্ধার করে পুড়িয়ে দেয়। অভিযানের পর কিছুদিন বন্ধ থাকার পর ওই কারখানায় আবারও উৎপাদন শুরু হয়েছে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে। তবে এ প্রতিবেদকের উপস্থিতি টের পেয়ে দৌড়ে পালায় জাল তৈরীর কারিগররা।

এদিকে ‘চায়না দোয়ারের’ দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে মাছ ধরার অন্যতম উপকরণ বাঁশের চাঁই বা দেশি দোয়ার। বাঁশের চাঁইয়ের তুলনায় চায়না দোয়ারে কয়েকগুণ বেশি মাছ পাওয়া যায় বলে পেশাদার ও সৌখিন মাছ শিকারীরা চাঁইয়ের পরিবর্তে চায়না দোয়ার কিনতে ঝুঁকে পড়ছেন। এর ফলে বাজারে চাঁইয়ের চাহিদা ব্যাপক কমে গেছে।

পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার সবচেয়ে বড় চাঁই বিক্রির বাজার বেড়া উপজেলার পাটপট্টিতে অবস্থিত। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আগের বছরগুলোর তুলনায় বাজারে চাঁইয়ের সরবরাহ একেবারেই কম। কিন্তু বর্ষার শুরুতে চাঁই বিক্রির ধুম পরেছিল। এ নিয়ে প্রতিদিনের সংবাদে ‘‘ বেড়ায় জমে উঠেছে ‘চাঁই’ কেনা-বেচা ’’ শিরোনামে একটি সচিত্রে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। বর্ষার শুরুর দিকে কেনা-বেচা জমে উঠলেও এখন অর্থেকে নেমে এসেছে চাঁই এর কেনা-বেচা। এর কারন চায়না দোয়ার যাহাতে মাছ ধরা পরে বেশি।

চাঁই বিক্রি করতে আসা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সেলন্দা গ্রামের রজব আলী জানান, ৩০ বছর ধরে চাঁই বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। কিন্তু চায়না দোয়ারের কারণে বাজারে চাঁই আর চলছে না। এ বছরই চায়না দোযার বেশি চলছে। তবে বাঁশের তৈরী চাঁইএ ছোট মাছ ধরা পরে না বলে তিনি জানান।

এদিকে ঘুরে দেখা গেছে, দুই উপজেলার বিভিন্ন বাজারে অবাধে এই চায়না দোয়ার বিক্রি হচ্ছে। শুরুতে চীন থেকে সরাসরি আমদানি করার সময় এই জাল আকার ভেদে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হত। এখন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হওয়ায় ৫২ হাত দৈর্ঘ্যরে এই জালের দাম দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায় নেমে এসেছে।
বেড়া পৌর এলাকার চরপাড়া মহল্লার বিশ্বজিৎ হালদার ও নতুনভারেঙ্গা ইউনিয়নের সোনাপদ্মা গ্রামের সুচিত্র হালদারের বাড়িতে কারখানা বসিয়ে ‘চায়না দোয়ার’ জাল তৈরির অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিনে ওই দুটি স্থানে গিয়ে জাল তৈরির আলামতও দেখা গেছে। তবে তাঁরা দাবি করেন, না জেনে এক সময় এ ধরনের জাল তৈরি করলেও এখন আর তাঁরা তা আর করেন না। তবে বেড়া ও সাঁথিয়ার অনেক জায়গাতেই এ ধরনের জাল তৈরি হচ্ছে বলে তাঁরা জানান।

বেড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাহাদৎ হোসেন বলেন, ‘এই ধরনের জাল (চায়না দোয়ার) আমাদের এদিকে অনেকটাই নতুন। কারেন্ট জাল তৈরিতে ব্যবহৃত প্রায় একই উপাদান দিয়ে এ ধরনের জাল তৈরি হয় বলে এটা মাছ ও পরিবেশ উভয়ের জন্যই এটা হুমকিস্বরূপ। বেড়ায় এ ধরনের জালের কারখানায় আগেও অভিযান হয়েছে। অতি দ্বার দ্রুত অভিযান চালানো হবে।