বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

গ্রামের রাস্তায় এবার চালকের আসনে নারি

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:৪৩:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ অক্টোবর ২০২১
  • ৪৭ Time View

,বাঘা (রাজশাহী) প্রতিনিধি.

শখের বশে নয়,জীবন জিবীকার তাগিদে পেশা বদলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে নারিরাও। পুরুষের পাশাপাশি তারাও আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখেছে। পেশা হিসেবে অনেক নারিই বেছে নিচ্ছেন গাড়ি চালানোকে। যাদের দেখা মেলে শহরে।

তবে চালকের আসনে এখন গ্রামের রাস্তায় নেমেছে নারিরাও। তাদের একজন নারি চালক হচ্ছে জায়দা। স্বামী পরিত্যক্তা এই নারি ভ্যানের হেন্ডেল ধরে এখন চালকের আসনে বসে যাত্রী পরিবহন করছে। তার বাড়ি উপজেলার জোতকাদিরপুর গ্রামে। স্বামী শাহাজামাল আরেকটি বিয়ে করে অন্যত্র চলে যাওয়ার পর পেশা বদলিয়ে চালকের আসনে বসেছেন জায়দা।

তার সাথে কথা বলে জানা যায়,একদিকে দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। অন্যদিকে কালো চেহারার মেয়ে বলে কেই তাকে বিয়ে করতে চায়নি। একারণে ৩০বছর বয়সে বিয়ে করে আর সন্তানের মা হয়েছেন ৩৫ বছর বয়সে। গর্ভের ছেলে ভ’মিষ্ট হওয়ার আগে স্বামী শাহজামাল তাকে রেখে যখন অন্যত্র চলে যায়,তখন জীবন জীবিকার তাগিদে গ্রামের বিত্তবানদের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালাতেন।

এরমাঝে জন্ম নেয় একটি পুত্র সন্তান। টানপোড়নের সংসারে ভারতের সীমান্তবর্তী দৃর্গম চর এলাকার বাংলাবাজার গ্রাম ছেড়ে ছেলে জায়দুলকে সাথে নিয়ে ২০বছর আগে চলে আসেন উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের জোতকাদিরপুর গ্রামে। এই গ্রামে ৫ কাঠা জমি কিনে শুরু করেন নতুন জীবন। খেয়ে পরে বেঁচে থাকার তাগিদে কোন পেশাকেই ছোট করে দেখেননি কখনো। এভাবেই পার করেছেন জীবনের ৫০ বছর। এরমাঝে জানতে পারেন যোগ্যতা অনুসারে নারিরাও যে যার মতো চালকের আসনে বসেছে। লেখাপড়া না জানলেও সেই চিন্তা পেয়ে বসে তাকেও। চালকের আসনে বসে ব্যাটারি চালিত অটো উল্কার হ্যান্ডেল ধরে মাস দু’এক আগে নেমে পড়েন রাস্তায়।

এর আগে ঝিয়ের কাজসহ বিভিন্ন কাজ করতেন। সংসার খরচবাদে দিনে দিনে জমানো টাকা আর এনজিওর কাছ থেকে কিস্তিতে টাকা তুলে ৭০ হাজার টাকা দিয়ে একটি ব্যাটারি চালিত অটো উল্কা কিনেন। কয়েকদিনের প্রশিক্ষন নিয়ে ব্যাটারি চালিত অটো উল্কা কিনে বসেন চালকের আসনে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিজ এলাকা জোতকাদিরপুর থেকে নারায়নপুর হয়ে বাঘা পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করে প্রতিদিন আয় হয় প্রায় সাড়ে তিন’শ থেকে চার’শ টাকা পর্যন্ত। প্রতিদিনের অটো উল্কার ব্যাটারি চার্জ বাবদ ৫০টাকাসহ দু’জনের সংসার খরচ চলে এই আয় থেকে। খরচবাদে বাড়তি কিছু টাকা জমাও করেন প্রতিদিন। আর্থিক অনটনের মধ্যেও ছেলেকে ভর্তি করেছিলেন স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৫ বছর বয়সের ছেলে জায়দুল এখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। নিজে লেখাপড়া জানেন না। তার ইচ্ছা ছেলেকে উচ্চ শিক্ষিত করে গড়ে তোলা।
নারি অটো উল্কা চালক জায়দা বলেন, “দেশে বিভিন্ন যানবাহনে পেশাদার নারি চালক আরও বেশি দরকার । কারণ নারিদের জন্য পরিবহনের বিশেষ কোন সুবিধা নেই। এছাড়াও সব ধরনের পেশাদার সুবিধাভ’গী নারি ড্রাইভিংয়ে আরও এগিয়ে আসবে।

খামখেয়ালি স্বভাব আর অকারণে ধৈর্যহারা হওয়ার প্রবণতা নারিদের তুলনায় পুরুষের বেশি। তাই স্টিয়ারিং হুইলের উপর নারির হাতটিই নিরাপদ মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল। তাদের মতে গ্রামের নারিদের আগের চেয়ে উন্নত হলেও সার্বিকভাবে তারা এখনও প্রান্তিক পর্যায়েই রয়েছে। আর এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সবার আগে প্রয়োজন সবার মানসিকতার পরিবর্তন। যে কোন সাহসী পেশাতে নারিদের এগিয়ে আসতে পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

শাহদৌলা সরকারি কলেজের প্রভাষক আবু হানিফ বলেন, বর্তমানে রাস্তায় যে হারে গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে, চালকের আসনে নারি থাকলে এ হার কমে যাবে। বাংলাদেশের রাস্তায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হবে। সড়ক দুর্ঘটনা অনেক হারে কমে যাবে। কারণ মেয়েরা সহজে অধৈর্য হয় না। ওভারটেক করার প্রবণতা থাকবে না। এ পেশায় নারিরা এলে কমবে দুর্ঘটনার হার। গাড়ি চালক হিসেবে পুরুষের চেয়ে নারি বেশি নিরাপদ। গাড়ি চালক হিসেবে নারি ও পুরুষের ব্যবধান আছে। সে ক্ষেত্রে নারী চালকরাই এগিয়ে।

Tag :
Popular Post

গ্রামের রাস্তায় এবার চালকের আসনে নারি

Update Time : ১২:৪৩:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ অক্টোবর ২০২১

,বাঘা (রাজশাহী) প্রতিনিধি.

শখের বশে নয়,জীবন জিবীকার তাগিদে পেশা বদলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে নারিরাও। পুরুষের পাশাপাশি তারাও আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখেছে। পেশা হিসেবে অনেক নারিই বেছে নিচ্ছেন গাড়ি চালানোকে। যাদের দেখা মেলে শহরে।

তবে চালকের আসনে এখন গ্রামের রাস্তায় নেমেছে নারিরাও। তাদের একজন নারি চালক হচ্ছে জায়দা। স্বামী পরিত্যক্তা এই নারি ভ্যানের হেন্ডেল ধরে এখন চালকের আসনে বসে যাত্রী পরিবহন করছে। তার বাড়ি উপজেলার জোতকাদিরপুর গ্রামে। স্বামী শাহাজামাল আরেকটি বিয়ে করে অন্যত্র চলে যাওয়ার পর পেশা বদলিয়ে চালকের আসনে বসেছেন জায়দা।

তার সাথে কথা বলে জানা যায়,একদিকে দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। অন্যদিকে কালো চেহারার মেয়ে বলে কেই তাকে বিয়ে করতে চায়নি। একারণে ৩০বছর বয়সে বিয়ে করে আর সন্তানের মা হয়েছেন ৩৫ বছর বয়সে। গর্ভের ছেলে ভ’মিষ্ট হওয়ার আগে স্বামী শাহজামাল তাকে রেখে যখন অন্যত্র চলে যায়,তখন জীবন জীবিকার তাগিদে গ্রামের বিত্তবানদের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালাতেন।

এরমাঝে জন্ম নেয় একটি পুত্র সন্তান। টানপোড়নের সংসারে ভারতের সীমান্তবর্তী দৃর্গম চর এলাকার বাংলাবাজার গ্রাম ছেড়ে ছেলে জায়দুলকে সাথে নিয়ে ২০বছর আগে চলে আসেন উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের জোতকাদিরপুর গ্রামে। এই গ্রামে ৫ কাঠা জমি কিনে শুরু করেন নতুন জীবন। খেয়ে পরে বেঁচে থাকার তাগিদে কোন পেশাকেই ছোট করে দেখেননি কখনো। এভাবেই পার করেছেন জীবনের ৫০ বছর। এরমাঝে জানতে পারেন যোগ্যতা অনুসারে নারিরাও যে যার মতো চালকের আসনে বসেছে। লেখাপড়া না জানলেও সেই চিন্তা পেয়ে বসে তাকেও। চালকের আসনে বসে ব্যাটারি চালিত অটো উল্কার হ্যান্ডেল ধরে মাস দু’এক আগে নেমে পড়েন রাস্তায়।

এর আগে ঝিয়ের কাজসহ বিভিন্ন কাজ করতেন। সংসার খরচবাদে দিনে দিনে জমানো টাকা আর এনজিওর কাছ থেকে কিস্তিতে টাকা তুলে ৭০ হাজার টাকা দিয়ে একটি ব্যাটারি চালিত অটো উল্কা কিনেন। কয়েকদিনের প্রশিক্ষন নিয়ে ব্যাটারি চালিত অটো উল্কা কিনে বসেন চালকের আসনে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিজ এলাকা জোতকাদিরপুর থেকে নারায়নপুর হয়ে বাঘা পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করে প্রতিদিন আয় হয় প্রায় সাড়ে তিন’শ থেকে চার’শ টাকা পর্যন্ত। প্রতিদিনের অটো উল্কার ব্যাটারি চার্জ বাবদ ৫০টাকাসহ দু’জনের সংসার খরচ চলে এই আয় থেকে। খরচবাদে বাড়তি কিছু টাকা জমাও করেন প্রতিদিন। আর্থিক অনটনের মধ্যেও ছেলেকে ভর্তি করেছিলেন স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৫ বছর বয়সের ছেলে জায়দুল এখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। নিজে লেখাপড়া জানেন না। তার ইচ্ছা ছেলেকে উচ্চ শিক্ষিত করে গড়ে তোলা।
নারি অটো উল্কা চালক জায়দা বলেন, “দেশে বিভিন্ন যানবাহনে পেশাদার নারি চালক আরও বেশি দরকার । কারণ নারিদের জন্য পরিবহনের বিশেষ কোন সুবিধা নেই। এছাড়াও সব ধরনের পেশাদার সুবিধাভ’গী নারি ড্রাইভিংয়ে আরও এগিয়ে আসবে।

খামখেয়ালি স্বভাব আর অকারণে ধৈর্যহারা হওয়ার প্রবণতা নারিদের তুলনায় পুরুষের বেশি। তাই স্টিয়ারিং হুইলের উপর নারির হাতটিই নিরাপদ মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল। তাদের মতে গ্রামের নারিদের আগের চেয়ে উন্নত হলেও সার্বিকভাবে তারা এখনও প্রান্তিক পর্যায়েই রয়েছে। আর এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সবার আগে প্রয়োজন সবার মানসিকতার পরিবর্তন। যে কোন সাহসী পেশাতে নারিদের এগিয়ে আসতে পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

শাহদৌলা সরকারি কলেজের প্রভাষক আবু হানিফ বলেন, বর্তমানে রাস্তায় যে হারে গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে, চালকের আসনে নারি থাকলে এ হার কমে যাবে। বাংলাদেশের রাস্তায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হবে। সড়ক দুর্ঘটনা অনেক হারে কমে যাবে। কারণ মেয়েরা সহজে অধৈর্য হয় না। ওভারটেক করার প্রবণতা থাকবে না। এ পেশায় নারিরা এলে কমবে দুর্ঘটনার হার। গাড়ি চালক হিসেবে পুরুষের চেয়ে নারি বেশি নিরাপদ। গাড়ি চালক হিসেবে নারি ও পুরুষের ব্যবধান আছে। সে ক্ষেত্রে নারী চালকরাই এগিয়ে।