গুরুদাসপুরে শ্রমিকের হাটে মজুরী বৈষম্যে শিকার নারী শ্রমিকরা

মোঃ মাজেম আলীমোঃ মাজেম আলী
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৫:১৯ PM, ০৯ নভেম্বর ২০২১

মো. মাজেম আলী মলিন , 

অরুণোদয় হয়নী তখনও। শীত আর ঘন কুয়াশাকে উপেক্ষা করে দুরদুরান্ত থেকে হাজারো নারী শ্রমিকের পাশাপাশি পুরুষ শ্রমিকও আসছে প্রতিদিন ট্রাক,বাস,লসিমন,করিমনে গুরুদাসপুর শ্রমিকের হাটে। এ যেন শ্রমিকের মেলা। কৃষিকাজের প্রয়োজনীয় উপকরন-কাস্তে,কোদাল,মাথালসহ বিভিন্ন প্রকার নিড়ানী যন্ত্র হাতে নিয়ে নারী-পুরুষ,বৃদ্ধ,যুবক অসংখ্য কাজের মানুষ আসছেন এই শ্রমিকের হাটে। তবে কোন কেনা-কাটা নয়, এসেছেন শ্রম বিক্রি করতে।
পুরুষের পাশাপাশি দিন বদলের সাথে পাল্লা দিয়েই বাড়ছে নারী শ্রমিকের সংখ্যাও। জীবনে হার না মানা এসব নারী শ্রমিকেরা পুরুষের সাথে কাধে কাধ, হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছেন দিন রাত । বাসা-বাড়ী, মাঠ- ঘাট, এমনকি ফসলের জমিতেও। যেন একচিলতেদম ফেলানোর ফুসরত নেই তাদের । এগিয়ে যাবার সাহসী দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে কাজ করছেন দেশ থেকে দেশান্তওে নিজেদের প্রয়োজনেই।
জানাগেছে- নাটোরের গুরুদাসপুরের নয়াবাজার,হাজীরহাট,ভিটাবাজার এবং বড়াইগ্রাম উপজেলার মানিকপুর,রওশনপুর, রাজ্জাকমোড় ও থানারমোড়সহ বিভিন্ন জায়গায় বসচ্ছে এ সকল শ্রমিকের হাট। ভোর ৫টা থেকে শুরু হয়ে চলে সকাল ৮টা পর্যন্ত এই শ্রমিক ক্রয়-বিক্রয়ের আনুষ্ঠানিকতা। নতুন ধানকাটা,চারারোপন,রসুন লাগানোসহ নানাবিধ কাজ করার উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসচ্ছেন এ সকল শ্রমিক দু’পয়সা রোজগাড়ের জন্য। হিন্দু,মুসলিম,ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর নারী ও পুরুষ শ্রমিক রয়েছেন এই দলে।
শ্রমিকের এই হাটে শ্রম বিক্রি করতে আসা নবনিতা ওরাঁও জানান, সিরাজগঞ্জের মেরিগাছা গ্রাম থেকে দশ টাকা ভাড়ায় ট্রাকে চলে এসেছেন গুরুদাসপুরে ‘শ্রম বাজারে’ শ্রম বিক্রি করতে। শ্রম বিক্রি করেছেন ঠিকই, কিন্তু পাননি ন্যায্য মজুরি। ধারাবাহিক মজুরি বৈষম্যের এ গল্প নবনিতা ওরাঁওয়ের একার নয়। দারিদ্র্যের কালো আগুনে ঝলসে যাওয়া হাজারো নারী শ্রমিকের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রতিদিনের এ গল্প।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থেকে আসা মনিরসহ বেশ কয়েকজন জানান, তাদের এলাকা অপেক্ষাকৃত নিচু। সেখানে ইরি-বোরো আবাদ ছাড়া চলতি মৌসুমে কোনো কাজ নেই। তাই গুরুদাসপুরে রসুন রোপণ, ধানকাটাসহ সকল কাজ করতে এসেছেন। এই দলের সঙ্গে আসা গিতা রানীর মতে, তারা নিজের খেয়ে মজুরি পান ৩শত টাকা থেকে ৩শত ৫০ টাকা। অথচ অন্য সম্প্রদায়ের শ্রমিকেরা কৃষকের খেয়ে একই মজুরি পেয়ে থাকেন। আবার পুরুষ শ্রমিকেরা ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা করে মজুরি পান। অভাবের তাড়নায় মজুরি বৈষম্য মেনে নিয়েই প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার লড়াই করছেন তারা।
খোঁজ জানা যায়, কঠোর পরিশ্রমী, সহজ-সরল আর অপেক্ষাকৃত কম দামে শ্রমিক পাওয়ায় এ অঞ্চলে নারী শ্রমিকদের চাহিদা অনেক বেশি। কম মজুরিতে কৃষি শ্রম বিক্রি করেই তাদের সংসার পরিচালনা করতে হয়। চলনবিলের বিভিন্ন মাঠে ময়দানে কাজ করতে আসা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী শ্রমিক শ্যামলী রানী ও কুমারী আল্পনা রানী জানায়, সকাল ৮ থেকে ৪টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন শ্রম দিয়ে তারা মজুরি পাচ্ছেন ৩শ থেকে ৩শ৫০ টাকা। তাতে কোনো রকমে চলে যাচ্ছে তাদের সংসার।
গতকাল রোববার নয়াবাজারের শ্রমিকের হাটে গিয়ে দেখা যায়, গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম ছাড়াও তাড়াশ, সলঙ্গা, উল্লাাপাড়া, বগুড়া শেরপুর উপজেলা এলাকার নারী শ্রমিকরা দল বেঁধে এখানে জমায়েত হয়। এসব শ্রমিকের সবাই এসেছে ট্রাক-বাসের ছাদে, নছিমন কিংবা অটোভ্যানে। সকলের গায়েই রয়েছে শীতের পোশাক, হাতে কাজ করার উপকরন। কৃষক তাদের চাহিদামতো শ্রমিক দরদাম মিটিয়ে সরাসরি ভ্যান যোগে নিয়ে যাচ্ছেন মাঠে। আব্দুল মতিনসহ পাঁচজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধান কাটা, বিনা হালে রসুন রোপণ, সেখানে নাড়া (ধানের খড়) বিছানোসহ জমি তৈরির কাজ করানো হয় এসব শ্রমিককে দিয়ে। তা ছাড়া স্থানীয় শ্রমিকদের তুলনায় কম মজুরিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী শ্রমিকদের পাওয়া যায় বলে এদের কদর বেশি।
নাটোর কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুব্রত কুমার সরকার বলেন, চলনবিলে বসবাসরত আদিবাসীদের ঘরে ঘরে অভাব চলছে। নিরুপায় হয়ে তারা কম মজুরিতে শ্রম বিক্রি করছেন। অনেকে গ্রাম্য মহাজনদের কাছ থেকে অগ্রিম উচ্চ সুদে টাকা নিয়ে সংসার চালান যার ফলে কম মূল্যে শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা।

আপনার মতামত লিখুন :