ওমিক্রন ছড়াচ্ছে দাবানলের মতো !

মোঃ মাজেম আলীমোঃ মাজেম আলী
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১০:৪৩ AM, ২৫ জানুয়ারী ২০২২

বনলতা ডেস্ক.

দেশে করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন দাবানলের মতো ছড়াচ্ছে। ঘরে ঘরে করোনার উপসর্গ নিয়ে ভুগছেন রোগীরা। গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাসটি দ্রুত গতিতে। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই রোগীর চাপ বাড়ছে। আইসিডিডিআর,বি’র এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় করোনাভাইরাস আক্রান্তদের ৬৯ শতাংশের শরীরে ওমিক্রন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গত এক সপ্তাহে রোগী বেড়েছে ১৮১ শতাংশ। আর মৃত্যু বৃদ্ধির হার ৮৮ শতাংশ। নতুন করে একদিনে শনাক্ত হয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার রোগী।

এখন দৈনিক শনাক্তের হার ৩২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। প্রতি তিনজনে একজন করোনা রোগী ধরা পড়ছে। শনাক্তের হার যে গতিতে দৌড়াচ্ছে তাতে অতীতের রেকর্ড আজ-কালের মধ্যেই ভেঙে পড়বে। এ অবস্থায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। ভয় আর আতঙ্কে জনবহুল স্থানেও জন চলাচল আগের চেয়ে কমে গেছে। আজ থেকে সরকারি-বেসরকারি অফিস এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্ধেক জনবল নিয়ে কার্যক্রম চলবে। সরকারের তরফে বলা হয়েছে নতুন করে বিধিনিষেধের এক সপ্তাহ পার হলে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করা হবে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, করোনা শনাক্তের হার দ্রুতই বাড়ছে। দৈনিক শনাক্তের হার ৩২ দশমিক ৩৭ শতাংশে পৌঁছেছে। যা আগের দিন ছিল ৩১ দশমিক ২৯ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ২৮ হাজার ২৩৮ জনে। নতুন শনাক্তের ৬৪ শতাংশই ঢাকা মহানগরের বাসিন্দা। নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৮২৮ জন। আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৯০৬ জন। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত মোট শনাক্ত ১৬ লাখ ৯৯ হাজার ৯৬৪ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ৯৯৮ জন এবং এখন পর্যন্ত ১৫ লাখ ৫৭ হাজার ৮৫৯ জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। দেশে ৮৬০টি পরীক্ষাগারে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৫ হাজার ৯৯৯টি নমুনা সংগ্রহ এবং ৪৫ হাজার ৮০৭টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১ কোটি ২১ লাখ ৬২ হাজার ৬৮৭টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ৩২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৯১ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১৫ জনের মধ্যে ৯ জন পুরুষ এবং ৬ জন নারী। দেশে মোট পুরুষ মারা গেছেন ১৮ হাজার ৫০ জন এবং নারী ১০ হাজার ১৮৮ জন। তাদের মধ্যে বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৯১ থেকে ১০০ বছরের ১ জন, ৭১ থেকে ৮০ বছরের ৫ জন, ৬১ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে ৩ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের ৩ জন, ৩১ থেকে ৪০ বছরের ১ জন, ২১ থেকে ৩০ বছরের ২ জন রয়েছেন। মারা যাওয়া ১৫ জনের মধ্যে ঢাকায় ৬ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১ জন, রাজশাহী বিভাগে ১ জন, খুলনা বিভাগে ১ জন, বরিশালে ১ জন, সিলেটে ২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩ জন রয়েছেন। মারা যাওয়া ১৫ জনের মধ্যে ১২ জন সরকারি হাসপাতালে এবং ৩ জন বেসরকারি হাসপাতালে মারা গেছেন। নতুন শনাক্তের মধ্যে ঢাকা মহানগরের রয়েছেন ৯ হাজার ৪২৬ জন। যা একদিনে মোট শনাক্তের ৬৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে রয়েছেন ১০ হাজার ১৬৫ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৩৩ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১ হাজার ৭৮৫ জন, রাজশাহী বিভাগে ৭৯৮ জন, রংপুর বিভাগে ২৫৪ জন, খুলনা বিভাগে ৬৮৮ জন, বরিশাল বিভাগে ২৫৭ জন এবং সিলেট বিভাগে ৫৪৮ জন শনাক্ত হয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত সপ্তাহের তুলনায় (১৭ থেকে ২৩শে জানুয়ারি) শনাক্ত রোগী বেড়েছে ১৮০ দশমিক ৮ শতাংশ। এসময় মৃত্যু বৃদ্ধির হার ৮৮ দশমিক ১ শতাংশ। মারা যান ৭৯ জন। তাদের মধ্যে ৫১ জন (৬৪ দশমিক ৬ শতাংশ ) টিকা গ্রহণ করেননি। ২৮ জন টিকা নিয়েছিলেন। তাদের হার ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ। তাদের মধ্যে প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন ৬ জন এবং ২২ নিয়েছিলেন দ্বিতীয় ডোজ। মারা যাওয়া ৭৯ জনের মধ্যে ৫২ জন (৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ) কো-মরবিডিটি বা জটিল রোগে ভুগছিলেন। এদের মধ্যে পুরুষ ৪৭ জন (৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ) এবং নারী ৩২ জন (৪০ দশমিক ৫ শতাংশ) রয়েছেন।

ঢাকায় ৬৯ শতাংশের শরীরে ওমিক্রন: ঢাকায় জানুয়ারি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে করোনাভাইরাস আক্রান্তদের ৬৯ শতাংশের শরীরে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি’) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা যায়।

সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্ততপক্ষে ওমিক্রনের তিনটি সাব-টাইপ ঢাকা শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। আইসিডিডিআর,বি’ জানুয়ারি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে ৩৭৯ জন কোভিড-১৯ রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে এসব তথ্য পেয়েছে। তাদের মধ্যে ২৬০ জনই ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হয়েছেন। শতকরা হিসাবে তা ৬৯ শতাংশ। দেশে করোনাভাইরাসের সর্বশেষ ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন শনাক্ত হয় ৬ই ডিসেম্বর। সেই সময় ৭৭ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে পাঁচ জনের শরীরে ওমিক্রন পেয়েছিল আইসিডিডিআর,বি’। বাকিরা ছিলেন ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত। আইসিডিডিআর,বি’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গত বছরের জানুয়ারি থেকে মধ্য মার্চ পর্যন্ত করোনাভাইরাসের আলফা ভ্যারিয়েন্টের আধিপত্য ছিল। গত বছরের মার্চ মাসে বেটা ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়। মে মাসের মধ্যেই সেই ধরনে আক্রান্তের সংখ্যা অন্য ধরনকে ছাড়িয়ে যায়। ২০২১ সালের মে মাস নাগাদ ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয় বাংলাদেশে। সেই বছরের জুন মাস নাগাদ আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ওমিক্রন শনাক্ত হয়। এরপর থেকে এটি দ্রুত বিস্তার করে চলেছে। আইসিডিডিআর’বি’ তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তারা ২৯ জন ওমিক্রন আক্রান্তের টেলিফোন সাক্ষাৎকার নিয়েছে, যাদের মধ্যে পুরুষ ১৩ জন আর নারী ১৬ জন। এদের মধ্যে ২৪ জনই কোভিড-১৯ দ্বিতীয় ডোজের টিকা পেয়েছেন আর তিনজন পেয়েছেন প্রথম ডোজের টিকা। এই ২৯ জন আক্রান্তের একজনকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। এদের একজন শুধুমাত্র সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন। অন্য কেউই দেশের বাইরে ভ্রমণ করেননি। এতে বলা হয়, ওমিক্রনে আক্রান্ত ২৯ জনের মধ্যে ২৭ জনের মৃদু উপসর্গ কিংবা কোনো উপসর্গও ছিল না। বুস্টার ডোজ নিয়েছেন একজন।

করোনা সংক্রমণ রোধে বিধিনিষেধ-
৭ দিন পর পরবর্তী নির্দেশনা দেবে সরকার করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনা করে আগামী সাতদিন পর বিধিনিষেধের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন এ কথা বলেন। এ সময় প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে- সবাই মাস্ক পরুক। এই সময়টা আমরা অতিক্রম করতে চাই। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী মধ্য ফেব্রুয়ারি নাগাদ এটি বাড়তে থাকবে। সবাইকে সচেতন হতে হবে। আমরা চাই এই তৃতীয় ঢেউ থেকে খুব তাড়াতাড়ি উত্তরণ ঘটাতে। সেজন্য সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। ৬ই ফেব্রুয়ারির পর বিধিনিষেধ বাড়তে পারে কিনা? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অবশ্যই পরিস্থিতি বিবেচনা করে সে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কারণ আমাদের সচেতনতার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। ওমিক্রন সেরে উঠতে অল্প সময় নিচ্ছে। রিকভারি রেট কিন্তু খুবই ভালো। ৮৫ শতাংশের বেশি সংখ্যক আক্রান্ত মানুষ ঘরে থেকে ট্রিটমেন্ট নিতে পারছেন এবং ভালো হয়ে যাচ্ছেন। আমরা অবশ্যই আগামী এক সপ্তাহ পর দেখবো, এটা কী পর্যায়ে আছে। সেই অনুযায়ী পরবর্তী নির্দেশনা দেবো। গণপরিবহনগুলো সরকারের বিধিনিষেধ মানছে না- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, সরকারের দেয়া বিধিনিষেধ সবাইকে মানতে হবে। নির্দেশনাগুলো সবাই মেনে চললে, তা সবার জন্যই ভালো। পরিবহন খাতে যারা আছেন তাদেরও আমাদের সহযোগিতা করতে হবে। নিয়ম মেনে তারা গণপরিবহন পরিচালনা করবেন। এর মধ্যদিয়ে আমরা একটা ভালো ফল পাবো। আশা করছি, অল্প সময়ের মধ্যে তৃতীয় ঢেউ থেকে উত্তরণ ঘটাবো। জনগণের উদ্দেশ্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আপনারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন। সবাইকে মাস্ক পরে বাইরে আসতে হবে। আমাদের অ্যানাউন্সমেন্টে বলা হবে আপনারা মাস্ক পরিধান করুন। সবাইকে জানিয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে উল্লেখ করে ফরহাদ হোসেন বলেন, একটি তারিখ দেয়া হবে যে ‘আগামীকাল থেকে মোবাইল কোর্ট নামবে’। মানুষ ইতিমধ্যে অবহিত হয়েছে যে, সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে। মানুষ সচেতন হওয়া শুরু করেছে। তাদের কাছে বার্তা চলে গেছে।

আপনার মতামত লিখুন :