সমুদ্র গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা !

সিন্ধু সেঁচে মুক্তার আশায় গবেষকরা

মোঃ মাজেম আলীমোঃ মাজেম আলী
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০১:৪০ PM, ২৩ মে ২০২২

বনলতা ডেস্ক. প্রাকৃতিক সম্পদের অন্যতম উৎস হচ্ছে সমুদ্র। একদিকে যেমন পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে অন্যদিকে তাদের খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিতে সমুদ্রের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতাও বাড়ছে। পৃথিবীর অনেক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ সমুদ্র অর্থনীতিকে কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়নের দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছে। বিশ্বঅর্থনীতিতে তিন থেকে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে সমুদ্র ঘিরে। বিশ্বের ৪৩০ কোটি মানুষের ১৫ শতাংশ প্রোটিনের জোগান দিচ্ছে সামুদ্রিক মাছ ও উদ্ভিদ। ৩০ শতাংশ গ্যাস ও জ্বালানি তেল আসছে সাগর থেকে। বাংলাদেশের সামনেও অপার সম্ভাবনা হয়ে ধরা দিয়েছে সমুদ্র। দেশের অর্থনীতির বিশাল মাইলফলক হয়ে আসছে নীল অর্থনীতি। এ নিয়ে ইয়াহহিয়া নকিবের বিশেষ প্রতিবেদন ‘নতুন দিগন্তে সমুদ্র গবেষণা’।

সমুদ্র বিজয়ের মধ্যদিয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রিক এলাকার বিশাল সম্ভাবনা ধরা দিয়েছে বাংলাদেশের সামনে। এই সমুদ্রে মৎস্য সম্পদ ছাড়াও আরও রয়েছে অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ। বঙ্গোপসাগরে ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের মতো মহামূল্যবান ধাতুর পাশাপাশি ক্লে পাওয়া যায়। এটি সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বিশ্বের অর্ধেক পণ্য ও জ্বালানিবাহী জাহাজ এ সমুদ্রপথ ব্যবহার করছে। বছরে চলাচল করছে প্রায় ৪০ হাজার জাহাজ। তবে তেল-গ্যাসসহ সমুদ্রভর্তি সম্পদ থাকলেও পর্যাপ্ত গবেষণার অভাবে তা আহরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

দেশের সমুদ্রবিজ্ঞানীরা বরাবরই বলে আসছেন গভীর সমুদ্রে যাওয়ার পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকা, গবেষণা সামগ্রীর অপ্রতুলতাসহ বিভিন্ন উপাদানের সংকট রয়েছে। ফলে সমুদ্র সম্পদ নিয়ে গবেষণা ও মূল্যবান সম্পদ আহরণের উদ্যোগ নিতে পারছেন না তারা। সমুদ্রের ব্যাপক সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে স্বাধীনতার পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে ‘দিন টেরিটোরিয়াল ওয়াটারস অ্যান্ড মেরিটাইম জোনস অ্যাক্ট’ পাস করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিওআরআই) স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘদিন পরে ২০০০ সালে জাতীয় সমুদ্র বিজ্ঞান গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

পরে ২০১৫ সালে জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট আইন পাস হয়। ২০১৭ সালে ইনস্টিটিউট-এর প্রবিধানমালা প্রণয়ন করা হয়। ২০১৮ সাল থেকে পুর্ণাঙ্গরূপে বিওআরআই গবেষণা কার্যক্রম শুরু করে। এখন সরকার এ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ‘বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (২য় পর্যায়)’ নামে নতুন একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে সমুদ্র সম্পদ নিয়ে গবেষণার জন্য কেনা হবে বড় জাহাজ।

এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘দেশের সমুদ্র সম্পদ নিয়ে আরও গবেষণার জন্য ইনস্টিটিউটের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। এর মাধ্যমে বিশাল সমুদ্রের তলদেশে আমাদের কী সম্পদ রয়েছে তা জানা যাবে।’ এ প্রকল্পে ব্যয় হবে ৪৪৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এর আওতায় ১৪টি মেরিন ল্যাবে ৪২২টি আধুনিক গবেষণা সরঞ্জাম কেনা হবে। কেনা হবে একটি স্যাম্পল কালেক্টিং বোট বা ৩২ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা জাহাজ। এর ৩টি ল্যাবে সমুদ্রের সমুনা ও ডাটা সংগ্রহের যন্ত্রপাতি থাকবে। জাহাজটির জন্য ২০০ মিটার পন্টুনসহ জেটি ও গ্যাংওয়ে নির্মাণ করা হবে।

তাছাড়া স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ডাটা সংগ্রহের জন্য একটি ওশান অবজারভেশন সিস্টেম স্থাপন করা হবে। ৪ হাজার ৪২৪টি কম্পিউটার সফটওয়্যার, অফিস সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র কেনা হবে। দক্ষ জনবল তৈরির জন্য ৬ তলা একটি ট্রেনিং সেন্টার কাম হোস্টেল নির্মাণ করা হবে। যন্ত্রপাতি তৈরির জন্য একটি ৩ তলা ওয়ার্কশপ ভবন নির্মাণ করা হবে। এক হাজার ৩৬৫ বর্গ কিলোমিটার ট্রান্সপোর্ট পুল নির্মাণ করা হবে। স্থাপন করা হবে মেরিন বায়োলজিক্যাল কালচার ইউনিট। এবছর থেকে শুরু হয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। এরজন্য পুরো টাকা সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় করা হবে।

এ প্রকল্পের বিষয়ে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বিওআরআই) মহাপরিচালক সাইদ মাহমুদ বেলাল হায়দর বলেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে সমুদ্রের উপকূল থেকে ১০০ কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত এলাকার সমুদ্র সম্পদ অন্বেষণ করা যাবে ও ইনস্টিটিউটের পূর্ণাঙ্গ গবেষণার সক্ষমতা তৈরি হবে। ফলে ওশানোগ্রাফি সম্পর্কিত দক্ষ জনবলও তৈরি হবে। সর্বোপরি এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের সমুদ্র গবেষণার পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা সৃষ্টি হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরের তলদেশে বিশাল খনিজ সম্পদ রয়েছে। কিন্তু সমুদ্র গবেষণা বা ব্লু-ইকোনমিবিষয়ক অনুসন্ধানের জন্য উপযোগী সমুদ্রযানও ছিল না বাংলাদেশের। ছোট বোটের মাধ্যমে সীমিত আকারে কার্যক্রম চালানো হতো। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এসব বোট সমুদ্রের ১০-১২ কিলোমিটারের বেশি যায় না। ফলে বিশাল সমুদ্রে কী সম্পদ লুকিয়ে আছে তা সঠিকভাবে অনুসন্ধান করা যায় না। এ জন্য ছোট ছোট ডিঙি নৌকার বদলে বড় জাহাজ কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে করে সমুদ্রের ১০০ কিলোমিটার গভীরে যাওয়া যাবে। এ ছাড়া ১০-১২ দিন সমুদ্রে অবস্থান করে স্যাম্পল সংগ্রহ করা যাবে এই জাহাজে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের জিইডি বিভাগের সচিব ড. কাউসার আহমেদ বলেন, ‘নতুন প্রকল্পের আওতায় ৩২ মিটার লম্বা একটি জাহাজ কেনা হবে। এর সঙ্গে দুটি স্পিডবোটও থাকবে। যেগুলো উপকূল থেকে শুরু করে দূরবর্তী স্থান থেকেও নমুনা সংগ্রহ করবে। সমুদ্র সম্পর্কে বলতে গেলে আমাদের ডেটা একেবারেই নাই, খুবই খারাপ অবস্থায় আছি। তাই দেশে প্রথমবারের মতো ৫টি বয়া স্থাপন করা হবে। যেগুলো অটোমেটিক্যালি বিভিন্ন ডেটা সরবরাহ করবে।’ সমুদ্র গবেষণা নিয়ে কাজ করা এ সচিব জানান, ‘বঙ্গপোসাগরের পাঁচটি মৎস্য আহরণ কেন্দ্রে এসব বয়া বসানো হবে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা সেখানে গবেষণারও সুযোগ পাবেন।’

প্রকল্প প্রস্তাবনায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বলছে, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বিশাল এই সমুদ্র এলাকায় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের। ফলে খুলে যায় নীল বিপ্লবের অপার দুয়ার। দেশের সমুদ্র গবেষণায় পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা সৃষ্টির মাধ্যমে সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি উন্নয়নে সফলতা অর্জন নতুন প্রকল্পের উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের অনাবিষ্কৃত সম্পদ অন্বেষণে গবেষণা, সমুদ্রের পরিবেশ সংরক্ষণ, সমুদ্র গবেষণায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি, জনগণের মধ্যে সুনীল অর্থনীতি সম্পর্কিত ধারণা এবং বৈজ্ঞানিক মনোভাব সঞ্চার হবে।

সমৃদ্ধি ও সম্ভাবনার সমুদ্র
দেশের আয়তনের প্রায় সমান সমুদ্রসীমা রয়েছে বাংলাদেশের। বঙ্গোপসাগরে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের সব ধরণের খনিজ আহরণের সুযোগ রয়েছে। এখন এসব সম্পদ অনুসন্ধানের মাধ্যমে কাজে লাগানোর হাতছাতি দেশের সামনে।

বিশ্বব্যাংক একটি রিপোর্টে বলেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির অবদান ছিল ৬.২ বিলিয়ন ডলার যা মোট জিডিপির ৩ শতাংশের সমান। অর্থনীতির গুরুত্ব বিবেচনায় ব্লু ইকোনমির সব সেক্টরের মধ্যে সামদ্রিক তেল-গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সামদ্রিক মৎস্য ও পর্যটন খাতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাছাড়া বিশ্বে ব্যবহৃত ম্যাগনেশিয়ামের মোট ৫০ শতাংশই আসে সমুদ্র থেকে। এ ছাড়া সমুদ্র থেকে আহরিত পটাশিয়াম লবণের সার ও রসায়ন শিল্পে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

দেশে বর্তমান সিমেন্ট শিল্পের পরিমাণ ১.৭৪ বিলিয়ন ডলার ও বার্ষিক সিমেন্ট উৎপাদন ৫০.২ মিলিয়ন টনের বেশি। ২০১৩-১৪ সালে বাংলাদেশ ৬১৯ মিলিয়ন ডলারের বেশি শুধু সিমেন্টের কাঁচামাল আমদানি করেছে। বঙ্গোপসাগর থেকে ক্লে উৎপাদন করা/আহরণ করা সম্ভব হলে এই বিপুল পরিমাণ আমদানি খরচের সিংহভাগই বেঁচে যাবে।

ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের এক জরিপ বলছে, বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস মজুতের এক শতাংশ (প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট) লুকিয়ে আছে ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের উপকূল বরাবর সাগরের তলদেশে। ফলে তেল-গ্যাস ছাড়াও সমুদ্রের বাতাস ও ঢেউ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও যেতে পারে বাংলাদেশ।

আপনার মতামত লিখুন :