বর্ষার অপরূপ সাজে চলনবিল

 মোঃ মাজেম আলী
প্রকাশিত :  ০৫:২৫ PM. ১৬ জুলাই ২০২২

প্রভাষক মোঃ মাজেম আলী মলিন. “একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী-জননী। ফুলে ও ফসলে কাঁদা মাটি জলে ঝলমল করে লাবনি”। জাতীয় কবি কাজী নজরুলের এই বিখ্যাত গানই মনে করিয়ে করে দেয় গ্রাম-বাংলার চিরায়ত এই রূপের কথা। বর্ষায়কাল জুড়েই ভ্রমন পিপাঁসুদের পদচারণায় মুখরিত থকে চলনবিল।

ছোট্ট ছোট্ট ভূখন্ড। প্রান্তজুড়ে বিশাল জলরাশি। বর্ষায় উন্মুক্ত মাছ, পালতোলা ও ইঞ্জিন চালিত নৌকার বাহারী সব সাঁজ। আর শুকনো মৌসুমে বছুরজুড়েই নানা রকম শস্যে সজ্জিত থাকে এই বিলাঞ্চল। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎসহ ষড়ঋতুতেই দেখা মেলে অপরূপ বৈচিত্র্যের নানা নিদর্শন। মানুষে মানুষেও রয়েছে সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ। সকল ধর্ম-বর্ণ ও নানা পেশাজীবী মানুষের সহাবস্থান।

ঈদ উপলক্ষে চলনবিলের সিংড়া, চাটমোহর ও বিলশাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভীড় লক্ষ্য করা যায়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসা ভ্রমণপিপাসু মানুষগুলো ঈদ আনন্দ একটু বাড়িয়ে নিতে চলনবিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। নানা শ্রেণীপেশার মানুষ এখানে এসে ভীড় করে একটু প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসার জন্য।

এশিয়ার সর্ব বৃহৎ বিল চলনবিল। একমাত্র খরশ্রোতা বিল হওয়ায় এই বিলের নামকরণ হয়েছে চলনবিল। এখন বর্ষাকাল হওয়ায় বিলটি ফিরে পেয়েছে তার চিরচেনা রূপ। প্রয়োজনের তাগিদেই ভাসমান মানুষ গুলো ডিঙি নৌকায় ছুটে চলেছে দিগবিদিক। দ্বীপের মত গ্রামগুলো যেন একেকটা ভাসমান বাজার। বর্ষায় এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম, এক পাড়া থেকে অন্য পাড়া, গ্রাম থেকে শহর, স্কুল-কলেজ, হাট-বাজারসহ যোগাযোগের সব জায়গায় ভাসমান মানুষগুলোর নিত্য সাথীই যেন ঐতিহ্যবাহী ডিঙি নৌকা। বর্ষা এলেই চারদিক অথৈই জলে ডুবে যায় মাঠ-ঘাট রাস্তাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। তখনই দেখা যায় চলনবিলের ঐতিহ্যবাহী বাহারী সব ডিঙি নৌকা। কোনোটা চলছে পাল উড়িয়ে, কোনোটা ঠেলা নৌকা, কোনোটা আবার ইঞ্জিনচালিত নৌকা। চলনবিলাঞ্চলের অধিকাংশ রাস্তা ঘাট (সাবমার্চেবল) বর্ষা এলেই পানির নিচে ডুবে যায়। তখন ডিঙি নৌকাই হয় যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম।

চলনবিলের মাঝ দিয়ে বয়েচলা রাস্তার দু’পাশে বিশাল জলরাশি, যেদিকে চোখ যায় শুধু থৈ থৈ পানি আর পানি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভ্রমণপিপাসু মানুষগুলো নৌকা, বাস, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে ছুটে আসেন চলনবিলকে কাছ থেকে এক নজর দেখার জন্য।

নাটোর জেলার একমাত্র চলনবিলযাদুঘরে গিয়ে দেখা যাবে বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোর প্রতিচ্ছবি। এখনো দেখা যায় গহনার নৌকা, তালের ডোঙ্গা, কলাগাছের ভেলা (ভুরা), পানসী নৌকা, গরু ও মহিষের গাড়ি, পালকি ও ডুলি, ঘোড়া, সেঁউতি, যাঁতাকল, বাথান, খরম, হুকা, পাতকুয়া, তফিল এবং গাইজা, বাদ্যযন্ত্র, কলের গান, পলো বিভিন্ন দেশের টাকা মুদ্রা, তীর-ধনুকসহ বাহারী সব প্রাচীন তৈজসপত্র।

এছাড়া চলনবিলের বুকচিরে নির্মিত হয়েছে মা জননী সেতু। যা হাজার বছরের অবহেলিত গ্রামগুলোকে গেঁথে রেখেছে এক সুতোয়। বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলো এখন যোগাযোগের রাখি বন্ধনে আবদ্ধ। সেতুকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বাহারী সব পিকনিক স্পট স্বর্ণদীপ ও গ্রীনল্যান্ড,আনন্দ নগর শিশুপার্ক, ভাসমান কফি হাউজসহ অসংখ্য দোকানপাট যা চলনবিলকে করেছে আকর্ষণীয়। এছাড়া সিংড়া উপজেলায় রয়েছে বেদে পল্লী, ঘাঁসি দেওয়ানের মাজার, কবিরগঞ্জ পর্যটন কেন্দ্র ও হাইটেক পার্ক। তাড়াশ উজেলায় রয়েছে গোবিন্দ নাট মন্দির, বিলসারা বেহুলা লক্ষিন্দরের কূপ, শাহ শরিফ জিন্দানী (র.) মাজার শরীফ।

চলন বিলের সৌন্দর্যকে আরো আকর্ষণীয় করেছে বালিহাঁস, তিরমূল, বাটুলে, মুরগীহাঁস, খয়রা, মানিক জোড়, ডুটরা, চাতক-পাখি, লোহাড়াং, মেমারচ, বোতক, নলকাক, সাদা বক, কানা বক, ফেফী, ডাহুক, চখা, বকধেনু, ইচাবক, করা, কাছিচোরা, রাতচোরা, ভুবনচিলা, মাছরাঙা, পানকৌড়িসহ নানা প্রজাতির পাখি। যেগুলোতে চোখ পড়লে পলক ফেলতে ইচ্ছে করে না। চলনবিল যেন এক অপরুপ সৃষ্টি।

চলনবিল নাটোর জেলার গুরুদাসপুর, সিংড়া, বড়াইগ্রাম; নওগাঁ জেলার রানীনগর, আত্রাই; সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া; পাবনা জেলার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, বেড়া, এবং বগুড়া জেলার দক্ষিণাঞ্চল মিলে চলনবিলের অবস্থান। মোট ৮ টি উপজেলার ৬২ টি ইউনিয়ন এবং ৮ টি পৌরসভা নিয়ে বর্তমানে চলনবিল গঠিত। যার গ্রাম সংখ্যা ১৬শ টি, লোকসংখ্যা প্রায় ২০ লক্ষাধিক। এখানে রয়েছে ২১টি নদী ও ৯৩টি ছোট-বড় বিল। উরাও, মাহাতো, তুরি, লোহারা, বসাক, রায়, পাচান, ঋষি, রবিদাস, কোচ এবং সিং ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠির বসবাস। ফলে এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে বিভিন্ন সংস্কৃতির সংমিশ্রণ আছে।

আপনার মতামত লিখুন :

এই বিভাগের সর্বশেষ

x