শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

অন্ধবিশ্বাস ভ্রান্তধারনা আর কুসংস্কার থেকেই গুজবের সৃষ্টি

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:৪৪:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২০
  • ৯১ Time View

প্রভাষক মো.মাজেম আলী মলিন
কোন বিষয় সম্পর্কে অন্ধবিস্বাস বা ভ্রান্ত ধারনাই হলো কুসংস্কার যার কোন ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক কোন ভিত্তি নেই। আর এই কুসংস্কার থেকেই গুজবের সৃষ্টি হয়। গুজব থেকেই শুরু হয় সহিংসতা যা গোটা দেশ ব্যাপী ছড়িয়ে পরে। শাসক দলকে পড়তে হয় বিপাকে। এতে করে সমাজে দেখা দেয় বিশৃংখলা। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে উঠে পরে লাগে এক শেণির ধর্ম কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল। এরকম তান্ডব বাংলাদেশে বহুবার ঘটেছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে- একজন লোক বললো এক রাজার একটা কালো সন্তান হয়েছে। আরেকজন তার কাছে শুনে বললো কাকের মত কালো হয়েছে,তার পর শুরু হলো রাজার বউয়ের পেটে থেকে কাক জন্মেছে, কেউবা বলছে ঝাক ঝাক কাক জন্ম নিচ্ছে আর উড়ে যাচ্ছে।
দেলোয়ার হোসেন সাইদিকে চাঁদে দেখা ধর্মকে পুঁজি করে উসকানি ছাড়ানো আর কিছুই নয়। অথচ এক শেণির শিক্ষিত মানুষ উঠে পরে লাগলো ওই ঘটনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে। আমাদের কলেজের কয়েকজন শিক্ষক আমার সামনে যুক্তি দেখাতে লাগলো যে, সে নিজে সাইদিকে দেখেছে চাঁদে। তার সাথে যোগ দিল অসংখ্য অন্ধভক্ত। আমি শুধুই চেয়ে চেয়ে দেখলাম আর শুনলাম। তাদের সংখ্যা গড়িষ্ঠতা আর সামাজিক যোগাযোগ মাধমেও তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষের ঝড় দেখে আমি হতবাক আর বিস্মিত হলাম।
শহরের এক উচ্চ শিক্ষিত পরিবারের এক মেয়ে প্রেমের টানে ঘর ছাড়ে । তাকে ফিরিয়ে আনতে ২০ হাজার টাকার তাবিজ ক্রয় করে গোরস্থানে পুঁতে রাখা হয়। এই বিশ^াসে যে, সে তিন দিনের মধ্যে পরিবারে ফিরে আসবে। ফিরে ঠিকই আসে কিন্তু তাবিজের কারনে নয় স¦ামী মাদকাসক্তের কারনে। তখন ওই পরিবারে বিশ^াস জন্মে এটা তাবিজের কারনেই সম্ভব হয়েছে। এতে করে তাদের মধ্যে এক ধরনের অন্ধবিশ^াস কাজ করে। যা দেখে সমাজের সাধারন মানুষের মধ্যেও ভ্রান্ত ধারনার সৃষ্টি হয়। এভাবেই শিক্ষিত অশিক্ষিত গ্রাম এবং শহরের সবর্ত্র সমাজের শিরা উপশিরায় অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কার ছড়িয়ে পড়ছে। তাই কুসংস্কার থেকে বাঁচতে হলে সুশিক্ষা এবং সচেতনতার বিকল্প নাই।
মুলত দেখা যায়, কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধ বিশ্বাসী অনেক লোক মনে করেন জমজ কলা খেলে জমজ সন্তান হবে। ডিম বা গোল্লা খেয়ে পরীক্ষায় গেলে গোল্লা পাওয়া যায়। রবিবার বাঁশ কাটলে বাঁশঝাড় উজাড় হয়ে যায়। রাতে টাকা দিলে দরিদ্র হযে যায়, বুধবার গোলা হতে ধান বের করা ঠিক না এত অমঙ্গল হয়। মুচি বা কলুর সাথে দেখা হলে কাজে অমঙ্গল হয়। অথচ কাজ হলে ওই কলু বা মুচির কথা মনে থাকে না। আর কাজ না হলেই ওই মুচির কথা মনে পরে যায। ওর জন্যই বোধহয় কাজটি হয়নি। বাম চোখ কাঁপলে মুছিবত আসে,ডান হাত চুলকালে টাকা আসে বামহাত চুলকালে টাকা চলে যায়। তাবিজ কবজ ঝারফুঁক এরকম অসংখ্য কুসংস্কার আমাদের ট্রাডিশনাল এবং লেবারেল সকল সমাজেই কম বেশী প্রচলিত আছে । যার কোন বৈজ্ঞানিক বা ধর্মীয় ব্যখ্যা নেই। বরং এই ধরনের কুসংস্কার বা অন্ধবিশ^াস থেকেই গুজবের সৃষ্টি হয় আর তা থেকেই শুরু হয় ধবংসাত্বক কার্যকলাপ। এক শেণির ধর্ম ব্যবসায়ী রাজনৈতিক দল সেগুলো কাজে লাগিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। যদিও মানুষ কুসংস্কারে নিমজ্জিত হয় ধর্মের অপব্যাখ্যা ,ভ্রান্ত ধারনা, বিজ্ঞান সম্মত জ্ঞানের অভাবের কারনে। সামাজিক কুসংস্কার থেকে মুক্তি পেতে সর্ব প্রথম সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, আধুনিক সুশিক্ষা,কর্মমুখি শিক্ষা,সাংস্কৃতিক চর্চা জোরদার করা,সঠিক ধর্মীয় জ্ঞান আর্জন করা, বিজ্ঞান মুখি শিক্ষা অর্জন করা, চিত্তবিনোদনের ব্যাবস্থা করা, খেলাধুলা ও পত্রিকা সহ বিভিন্ন ধরনের ভাল বই পাঠের বিকল্প নেই।
প্রভাষক মো.মাজেম আলী মলিন, বিভাগীয় প্রধান সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজ। সভাপতি গুরুদাসপুর মডেল প্রেসক্লাব,গুরুদাসপুর,নাটোর।

Tag :

অন্ধবিশ্বাস ভ্রান্তধারনা আর কুসংস্কার থেকেই গুজবের সৃষ্টি

Update Time : ০১:৪৪:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২০

প্রভাষক মো.মাজেম আলী মলিন
কোন বিষয় সম্পর্কে অন্ধবিস্বাস বা ভ্রান্ত ধারনাই হলো কুসংস্কার যার কোন ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক কোন ভিত্তি নেই। আর এই কুসংস্কার থেকেই গুজবের সৃষ্টি হয়। গুজব থেকেই শুরু হয় সহিংসতা যা গোটা দেশ ব্যাপী ছড়িয়ে পরে। শাসক দলকে পড়তে হয় বিপাকে। এতে করে সমাজে দেখা দেয় বিশৃংখলা। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে উঠে পরে লাগে এক শেণির ধর্ম কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল। এরকম তান্ডব বাংলাদেশে বহুবার ঘটেছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে- একজন লোক বললো এক রাজার একটা কালো সন্তান হয়েছে। আরেকজন তার কাছে শুনে বললো কাকের মত কালো হয়েছে,তার পর শুরু হলো রাজার বউয়ের পেটে থেকে কাক জন্মেছে, কেউবা বলছে ঝাক ঝাক কাক জন্ম নিচ্ছে আর উড়ে যাচ্ছে।
দেলোয়ার হোসেন সাইদিকে চাঁদে দেখা ধর্মকে পুঁজি করে উসকানি ছাড়ানো আর কিছুই নয়। অথচ এক শেণির শিক্ষিত মানুষ উঠে পরে লাগলো ওই ঘটনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে। আমাদের কলেজের কয়েকজন শিক্ষক আমার সামনে যুক্তি দেখাতে লাগলো যে, সে নিজে সাইদিকে দেখেছে চাঁদে। তার সাথে যোগ দিল অসংখ্য অন্ধভক্ত। আমি শুধুই চেয়ে চেয়ে দেখলাম আর শুনলাম। তাদের সংখ্যা গড়িষ্ঠতা আর সামাজিক যোগাযোগ মাধমেও তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষের ঝড় দেখে আমি হতবাক আর বিস্মিত হলাম।
শহরের এক উচ্চ শিক্ষিত পরিবারের এক মেয়ে প্রেমের টানে ঘর ছাড়ে । তাকে ফিরিয়ে আনতে ২০ হাজার টাকার তাবিজ ক্রয় করে গোরস্থানে পুঁতে রাখা হয়। এই বিশ^াসে যে, সে তিন দিনের মধ্যে পরিবারে ফিরে আসবে। ফিরে ঠিকই আসে কিন্তু তাবিজের কারনে নয় স¦ামী মাদকাসক্তের কারনে। তখন ওই পরিবারে বিশ^াস জন্মে এটা তাবিজের কারনেই সম্ভব হয়েছে। এতে করে তাদের মধ্যে এক ধরনের অন্ধবিশ^াস কাজ করে। যা দেখে সমাজের সাধারন মানুষের মধ্যেও ভ্রান্ত ধারনার সৃষ্টি হয়। এভাবেই শিক্ষিত অশিক্ষিত গ্রাম এবং শহরের সবর্ত্র সমাজের শিরা উপশিরায় অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কার ছড়িয়ে পড়ছে। তাই কুসংস্কার থেকে বাঁচতে হলে সুশিক্ষা এবং সচেতনতার বিকল্প নাই।
মুলত দেখা যায়, কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধ বিশ্বাসী অনেক লোক মনে করেন জমজ কলা খেলে জমজ সন্তান হবে। ডিম বা গোল্লা খেয়ে পরীক্ষায় গেলে গোল্লা পাওয়া যায়। রবিবার বাঁশ কাটলে বাঁশঝাড় উজাড় হয়ে যায়। রাতে টাকা দিলে দরিদ্র হযে যায়, বুধবার গোলা হতে ধান বের করা ঠিক না এত অমঙ্গল হয়। মুচি বা কলুর সাথে দেখা হলে কাজে অমঙ্গল হয়। অথচ কাজ হলে ওই কলু বা মুচির কথা মনে থাকে না। আর কাজ না হলেই ওই মুচির কথা মনে পরে যায। ওর জন্যই বোধহয় কাজটি হয়নি। বাম চোখ কাঁপলে মুছিবত আসে,ডান হাত চুলকালে টাকা আসে বামহাত চুলকালে টাকা চলে যায়। তাবিজ কবজ ঝারফুঁক এরকম অসংখ্য কুসংস্কার আমাদের ট্রাডিশনাল এবং লেবারেল সকল সমাজেই কম বেশী প্রচলিত আছে । যার কোন বৈজ্ঞানিক বা ধর্মীয় ব্যখ্যা নেই। বরং এই ধরনের কুসংস্কার বা অন্ধবিশ^াস থেকেই গুজবের সৃষ্টি হয় আর তা থেকেই শুরু হয় ধবংসাত্বক কার্যকলাপ। এক শেণির ধর্ম ব্যবসায়ী রাজনৈতিক দল সেগুলো কাজে লাগিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। যদিও মানুষ কুসংস্কারে নিমজ্জিত হয় ধর্মের অপব্যাখ্যা ,ভ্রান্ত ধারনা, বিজ্ঞান সম্মত জ্ঞানের অভাবের কারনে। সামাজিক কুসংস্কার থেকে মুক্তি পেতে সর্ব প্রথম সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, আধুনিক সুশিক্ষা,কর্মমুখি শিক্ষা,সাংস্কৃতিক চর্চা জোরদার করা,সঠিক ধর্মীয় জ্ঞান আর্জন করা, বিজ্ঞান মুখি শিক্ষা অর্জন করা, চিত্তবিনোদনের ব্যাবস্থা করা, খেলাধুলা ও পত্রিকা সহ বিভিন্ন ধরনের ভাল বই পাঠের বিকল্প নেই।
প্রভাষক মো.মাজেম আলী মলিন, বিভাগীয় প্রধান সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজ। সভাপতি গুরুদাসপুর মডেল প্রেসক্লাব,গুরুদাসপুর,নাটোর।