বৃহস্পতিবার, ০৮ জুন ২০২৩, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

শস্যভান্ডারে পুকুর খনন,বন্ধে চলছে নাটক!

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:২৬:০৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২০
  • ৩৫ Time View

বনলতা নিউজ ডেস্ক.

ধানের চেয়ে মাছ চাষে বেশি লাভ আর বিভিন্ন স্থানে উর্বর মাটি বিক্রি করার অজুহাতেই নাটোরের চলনবিল অধুসিত শস্যভান্ডার খ্যাত এলাকাগুলোতে চলছে একের পর এক পুকুর খনন। প্রতিনিয়ত কৃষিজমি রূপান্তবিত হচ্ছে জলাশয়ে। এতে করে দিন দিন কমে যাচ্ছে আবাদযোগ্য ভূমি আর হ্রাস পাচ্ছে কৃষি উৎপাদন। এদিকে জনপ্রতিনিধি,প্রশাসন আর থানা পুলিশকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে সাবার করছে সোনালী ফসলের মাঠ। কিন্তু তাতে কার কি আসে যায়। কিছুটা ছেড়ে দিয়ে তাড়িয়ে ধরার মতো আর কি। করোনা নিয়ে বাজারে যেমন পুলিশ পেদানী দিয়ে চলে যাবার সাথে সাথে আবার সেই জনসমুদ্র থেকেই যায়। তদরুপ পুকুর খননের অবস্থাও একই রকম।

গুরুদাসপুরের স্থানীয় কিছু কৃষকের সাথে কথা হয় তারা জানান, ২০বিঘা পুকুর কাটলে ৪০ বিঘা আবাদি জমি জ¦লাশয়ে পরিনত হয়। ৪০ বিঘা কাটলে ৮০ বিঘায় সমস্যা দেখা দেয় এভাবে চলতে থাকলে মাছে ভাতে বাঙ্গালী নয় মাছে মাছে বাঙ্গালী হয়ে যাব আমরা। তখন ইচ্ছা করলেও আর ওই পুকুর গুলো আর বন্ধ করা সম্ভব হবেনা।

এই চলনবিলেরই বিশাল একটি অংশ নাটোরের গুরুদাসপুর। এ অঞ্চলের জমি উর্বর পলি সমৃদ্ধ হওয়ায় ইরি-বোরো মৌসুমে বিপুল পরিমাণ ধান, শীত মৌসুমে রবিশস্য উৎপাদন হয়ে থাকে। বিভিন্ন মৌসুমে নানা ফসলে ভরে থাকে মাঠ। কিন্তু নানা প্র্রতিকূলতায় নিজ ভুমির অপার সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। গত কয়েক বছর ধরে মাঝখানে যত্রতত্র পুকুর খননের কারণে ফসলী জমির মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। সচেতন মহল মনে করছে, অবাধ পুকুর খননের কারণে ভবিষ্যতে হয়তো এ অঞ্চলে আবাদযোগ্য কোনো জমিই থাকবে না।

সরেজমিন দেখা যায়, কিছু প্রভাবশালী মাটি ব্যবসায়ীর প্রলোভনে পড়ে কৃষকরা তাদের দুই বা তিন ফসলি জমি পুকুরে পরিণত করছেন। মাটি ব্যবসায়ীরা কয়েকজন কৃষকের জমি পাঁচ/সাত বছরের জন্য লিজ নিয়ে শুরু করেছেন পুকুর খনন। বছরে বিঘা প্রতি ১৮ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষককে দেওয়া হচ্ছে। নগদ টাকার নেশায় কৃষকরা একের পর এক পুকুরের দিকেই ঝুঁকছেন। উপজেলার  বিভিন্ন এলাকা ঘুরে অবাধ পুকুর খননের নানা  রুপ চিত্র দেখা যায়।

কথা হয় আবুল কালাম, সাবেদ আলী, লোকমান আলী, আব্দুস ছাত্তার, মজিদ প্রামানিকসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে। তারা জানান, ধান, গম, আলু, রবিশস্যসহ অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদন করতে যে পরিমাণ খরচ হয় তা বিক্রি করে উৎপাদন খরচও ওঠে না। পুকুর কেটে লিজ দিলেও বছরে ২০/২৫ হাজার টাকা বিনা পরিশ্রমে পাওয়া যায়। তাছাড়া কয়েক বছর আগে থেকেই মাঠের মধ্যে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পুকুর খনন শুরু করেন। এ কারণে নির্মিত ওইসব পুকুরের আশপাশের জমিগুলোও জলাবদ্ধ হয়ে অনাবাদি পড়ে থাকে। অপরদিকে, চলনবিল অঞ্চলের ছোট ছোট খালগুলো ভরাট করে রাস্তা কিংবা বাড়ি নির্মাণ করায় অনেকের জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ফলে এসব জমিতে বছরে একবারও আবাদ করা সম্ভব হয় না। এ কারণে ওইসব জমির মালিকরা বাধ্য হয়ে পুকুর খনন করছেন।

ধারাবারিষা গ্রামের কৃষক আবু সাইদ, সফিকুুল ইসলাম ও ওবায়দুর রহমান জানান, হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়কের উত্তর পাশে একটি খাল ছিল। খালের মুখ ভরাট করে এক প্রভাবশালী ব্যক্তি বেশ কয়েকটি পুকুর কেটেছেন। ফলে ওই মৌজার সব জমিই বছরের বেশির ভাগ সময় জলাবদ্ধ থাকে। এ কারণেই বাধ্য হয়ে পুকুর নির্মাণ করতে হচ্ছে তাদের।

গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.তমাল হোসেন বলেন, আমরা মাঝ মধ্যেই ভ্রাম্যমান করছি পুকুর খননের বিরুদ্ধে। জনসাধারণ যদি সচেতন না হয় পুকুর খনন বন্ধ করা মুশকিল। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং থাকবে।

স্থানীয় সাংসদ আব্দুল কুদ্দুস বলেন, গতকাল ও আমি চাপিলা নাজিরপুর এবং বিয়াঘাটের সর্ব মোট ১৬টি পুকুর খনন বন্ধ করে আসলাম। কই আর কাউকে তো দেখলাম না।

নাটোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জানান, জেলার শস্যভান্ডার খ্যাত অঞ্চলগুলোতে ব্যাপক হারে পুকুর খননের বিষয়টি খুবই উদ্বেকজনক। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাবে। পুকুর খনন বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য মৌখিকভাবে জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

Tag :
Popular Post

গরমে মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা

শস্যভান্ডারে পুকুর খনন,বন্ধে চলছে নাটক!

Update Time : ১১:২৬:০৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২০

বনলতা নিউজ ডেস্ক.

ধানের চেয়ে মাছ চাষে বেশি লাভ আর বিভিন্ন স্থানে উর্বর মাটি বিক্রি করার অজুহাতেই নাটোরের চলনবিল অধুসিত শস্যভান্ডার খ্যাত এলাকাগুলোতে চলছে একের পর এক পুকুর খনন। প্রতিনিয়ত কৃষিজমি রূপান্তবিত হচ্ছে জলাশয়ে। এতে করে দিন দিন কমে যাচ্ছে আবাদযোগ্য ভূমি আর হ্রাস পাচ্ছে কৃষি উৎপাদন। এদিকে জনপ্রতিনিধি,প্রশাসন আর থানা পুলিশকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে সাবার করছে সোনালী ফসলের মাঠ। কিন্তু তাতে কার কি আসে যায়। কিছুটা ছেড়ে দিয়ে তাড়িয়ে ধরার মতো আর কি। করোনা নিয়ে বাজারে যেমন পুলিশ পেদানী দিয়ে চলে যাবার সাথে সাথে আবার সেই জনসমুদ্র থেকেই যায়। তদরুপ পুকুর খননের অবস্থাও একই রকম।

গুরুদাসপুরের স্থানীয় কিছু কৃষকের সাথে কথা হয় তারা জানান, ২০বিঘা পুকুর কাটলে ৪০ বিঘা আবাদি জমি জ¦লাশয়ে পরিনত হয়। ৪০ বিঘা কাটলে ৮০ বিঘায় সমস্যা দেখা দেয় এভাবে চলতে থাকলে মাছে ভাতে বাঙ্গালী নয় মাছে মাছে বাঙ্গালী হয়ে যাব আমরা। তখন ইচ্ছা করলেও আর ওই পুকুর গুলো আর বন্ধ করা সম্ভব হবেনা।

এই চলনবিলেরই বিশাল একটি অংশ নাটোরের গুরুদাসপুর। এ অঞ্চলের জমি উর্বর পলি সমৃদ্ধ হওয়ায় ইরি-বোরো মৌসুমে বিপুল পরিমাণ ধান, শীত মৌসুমে রবিশস্য উৎপাদন হয়ে থাকে। বিভিন্ন মৌসুমে নানা ফসলে ভরে থাকে মাঠ। কিন্তু নানা প্র্রতিকূলতায় নিজ ভুমির অপার সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। গত কয়েক বছর ধরে মাঝখানে যত্রতত্র পুকুর খননের কারণে ফসলী জমির মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। সচেতন মহল মনে করছে, অবাধ পুকুর খননের কারণে ভবিষ্যতে হয়তো এ অঞ্চলে আবাদযোগ্য কোনো জমিই থাকবে না।

সরেজমিন দেখা যায়, কিছু প্রভাবশালী মাটি ব্যবসায়ীর প্রলোভনে পড়ে কৃষকরা তাদের দুই বা তিন ফসলি জমি পুকুরে পরিণত করছেন। মাটি ব্যবসায়ীরা কয়েকজন কৃষকের জমি পাঁচ/সাত বছরের জন্য লিজ নিয়ে শুরু করেছেন পুকুর খনন। বছরে বিঘা প্রতি ১৮ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষককে দেওয়া হচ্ছে। নগদ টাকার নেশায় কৃষকরা একের পর এক পুকুরের দিকেই ঝুঁকছেন। উপজেলার  বিভিন্ন এলাকা ঘুরে অবাধ পুকুর খননের নানা  রুপ চিত্র দেখা যায়।

কথা হয় আবুল কালাম, সাবেদ আলী, লোকমান আলী, আব্দুস ছাত্তার, মজিদ প্রামানিকসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে। তারা জানান, ধান, গম, আলু, রবিশস্যসহ অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদন করতে যে পরিমাণ খরচ হয় তা বিক্রি করে উৎপাদন খরচও ওঠে না। পুকুর কেটে লিজ দিলেও বছরে ২০/২৫ হাজার টাকা বিনা পরিশ্রমে পাওয়া যায়। তাছাড়া কয়েক বছর আগে থেকেই মাঠের মধ্যে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পুকুর খনন শুরু করেন। এ কারণে নির্মিত ওইসব পুকুরের আশপাশের জমিগুলোও জলাবদ্ধ হয়ে অনাবাদি পড়ে থাকে। অপরদিকে, চলনবিল অঞ্চলের ছোট ছোট খালগুলো ভরাট করে রাস্তা কিংবা বাড়ি নির্মাণ করায় অনেকের জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ফলে এসব জমিতে বছরে একবারও আবাদ করা সম্ভব হয় না। এ কারণে ওইসব জমির মালিকরা বাধ্য হয়ে পুকুর খনন করছেন।

ধারাবারিষা গ্রামের কৃষক আবু সাইদ, সফিকুুল ইসলাম ও ওবায়দুর রহমান জানান, হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়কের উত্তর পাশে একটি খাল ছিল। খালের মুখ ভরাট করে এক প্রভাবশালী ব্যক্তি বেশ কয়েকটি পুকুর কেটেছেন। ফলে ওই মৌজার সব জমিই বছরের বেশির ভাগ সময় জলাবদ্ধ থাকে। এ কারণেই বাধ্য হয়ে পুকুর নির্মাণ করতে হচ্ছে তাদের।

গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.তমাল হোসেন বলেন, আমরা মাঝ মধ্যেই ভ্রাম্যমান করছি পুকুর খননের বিরুদ্ধে। জনসাধারণ যদি সচেতন না হয় পুকুর খনন বন্ধ করা মুশকিল। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং থাকবে।

স্থানীয় সাংসদ আব্দুল কুদ্দুস বলেন, গতকাল ও আমি চাপিলা নাজিরপুর এবং বিয়াঘাটের সর্ব মোট ১৬টি পুকুর খনন বন্ধ করে আসলাম। কই আর কাউকে তো দেখলাম না।

নাটোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জানান, জেলার শস্যভান্ডার খ্যাত অঞ্চলগুলোতে ব্যাপক হারে পুকুর খননের বিষয়টি খুবই উদ্বেকজনক। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাবে। পুকুর খনন বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য মৌখিকভাবে জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।