বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৫ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

হত্যার নাটক সাজিয়েও শেষ রক্ষা হলনা। মুক্তিয়ারা ও তার প্রমিকের

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:৫৭:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২০
  • ৮৪ Time View

‘আসল বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম। লাশটা খুঁজে নিস।’ এই খুদেবার্তা ও লাশ সদৃশ্য কিছু ছবি স্বামীর পরিবারের মুঠোফোনে পাঠানো হয় স্ত্রী মুক্তিয়ারার ইমো অ্যাকাউন্ট থেকে। ঘটনাটি জানানো হয় মুক্তিয়ারার বাবার বাড়িতে। মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে ভেবে মুক্তিয়ারার বাবা থানায় জামাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন। নিরুপায় হয়ে মুক্তিয়ারার স্বামী পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে ঘটনাটি মিথ্যা দাবি করে দ্রুত তদন্তের আবেদন করেন। তিন দিনের মধ্যেই পুলিশের তদন্তে বের হয়, ওই নারীকে আদৌ কেউ খুন করেননি। তিনি নিজেই লাশের অভিনয় করে মুঠোফোনে ছবি পাঠিয়ে অন্য যুবকের সঙ্গে সংসার করছেন।

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় এ ঘটনা ঘটেছে। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে নাটোরের পুলিশ সুপার খুন হওয়ার সাজানো নাটকের বিবরণ তুলে ধরেন। নতুন স্বামীসহ ওই নারীকে গ্রেপ্তারের পর আজই আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গৃহবধূ মুক্তিয়ারা ওরফে মুক্তি স্বামীর সঙ্গে পাবনার দাশুড়িয়ায় বসবাস করতেন। গত সোমবার সকালে তিনি স্বামীর সঙ্গে বাবার বাড়ি সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার কুন্দল গ্রামের উদ্দেশে রওনা হন। তাঁর স্বামী তাঁকে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার রাজাপুরের একটি অটোরিকশায় তুলে দিয়ে ফিরে যান। রাতে মুক্তিয়ারা ইমোতে বড় জায়ের মুঠোফোনে চারটি ছবি পাঠান। ছবিতে দেখা যায়, গামছা দিয়ে ঢাকা তাঁর মৃতদেহ, মুখের মধ্যে গামছা ঢোকানো। মুখমণ্ডলে মারপিটের দাগ, সঙ্গে একটি খুদেবার্তা পাঠানো হয়। তাতে লেখা হয়, ‘তুই যেই হোস, এই মেয়েটার আত্মীয়দের বলে দিস, আমি ওকে খালাস করে দিয়েছি। আমায় ফালতু ছেলে বলে। ওর সব জেদ আজকে শেষ করেছি। বাড়ি যাচ্ছিল, তাই না? আসল বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম। লাশটা খুঁজে নিস। টা টা।’ ছবি ও খুদেবার্তার সুবাদে মুক্তিয়ারার বাবা, মা ও স্বামীর পরিবারের সবাই ধরে নেয় তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। মুক্তিয়ারার বাবা মঙ্গলবার জামাইয়ের বিরুদ্ধে বরাইগ্রাম থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
মুক্তিয়ারার স্বামী নিজেই বড়াইগ্রাম থানায় হাজির হয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং ঘটনাটি দ্রুত তদন্তের আবেদন করেন। পুলিশ তদন্তের শুরুতেই যে মুঠোফোন থেকে ইমোতে খুদেবার্তা ও ছবি পাঠানো হয়েছিল তা পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে গতকাল বুধবার রাতে ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলার দেবগ্রামের আবদুল মোতালেবের ছেলে সানোয়ার আহম্মেদ ওরফে আবিদকে (২৪) আটক করেন। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর বাড়ি থেকে পুলিশ মুক্তিয়ারাকে জীবিত উদ্ধার করে।

মুক্তিয়ারা পুলিশের কাছে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি প্রেম করে মামাতো ভাই আকমল হোসেনকে বিয়ে করেছিলেন। দুই বছর পার না হতেই তিনি মুঠোফোনে সানোয়ারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সর্বশেষ নিজেকে স্বামী ও তাঁর পরিবার থেকে আড়াল করার জন্য খুনের সাজানো নাটক করেন। তিনি ইতিমধ্যে আবিদের সঙ্গে বিয়ে করে সংসার করেছেন। তাঁর সঙ্গেই থাকতে চান।

বড়াইগ্রাম সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হারুণ অর রশিদ জানান, উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা মুক্তিয়ারা টেলিভিশনে ক্রাইম প্যাট্রল দেখে সুকৌশলে সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে অন্যের সঙ্গে সংসার করতে চেয়েছিলেন। এ ধরনের ঘটনা সমাজে সচারচর দেখা যায় না। তিনি ও তাঁর নতুন স্বামী প্রতারণা করেছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহা জানান, ওই নারীর পাঠানো ছবিগুলো দেখলে কারও পক্ষেই তা নকল বলা সম্ভব না। অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিজেকে লাশ হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। একইভাবে খুদেবার্তার কথাগুলোও বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে। তাই পুলিশ প্রথমে তাঁর বাবার মামলা নিয়েছে। পরে তদন্তের সময় প্রকৃত বিষয় জানার চেষ্টা করেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে তা উদ্‌ঘাটন করেছে। এ জন্য তিনি বড়াইগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সার্কেল অফিসার ও ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে ধন্যবাদ জানান।

Tag :

হত্যার নাটক সাজিয়েও শেষ রক্ষা হলনা। মুক্তিয়ারা ও তার প্রমিকের

Update Time : ০১:৫৭:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২০

‘আসল বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম। লাশটা খুঁজে নিস।’ এই খুদেবার্তা ও লাশ সদৃশ্য কিছু ছবি স্বামীর পরিবারের মুঠোফোনে পাঠানো হয় স্ত্রী মুক্তিয়ারার ইমো অ্যাকাউন্ট থেকে। ঘটনাটি জানানো হয় মুক্তিয়ারার বাবার বাড়িতে। মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে ভেবে মুক্তিয়ারার বাবা থানায় জামাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন। নিরুপায় হয়ে মুক্তিয়ারার স্বামী পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে ঘটনাটি মিথ্যা দাবি করে দ্রুত তদন্তের আবেদন করেন। তিন দিনের মধ্যেই পুলিশের তদন্তে বের হয়, ওই নারীকে আদৌ কেউ খুন করেননি। তিনি নিজেই লাশের অভিনয় করে মুঠোফোনে ছবি পাঠিয়ে অন্য যুবকের সঙ্গে সংসার করছেন।

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় এ ঘটনা ঘটেছে। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে নাটোরের পুলিশ সুপার খুন হওয়ার সাজানো নাটকের বিবরণ তুলে ধরেন। নতুন স্বামীসহ ওই নারীকে গ্রেপ্তারের পর আজই আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গৃহবধূ মুক্তিয়ারা ওরফে মুক্তি স্বামীর সঙ্গে পাবনার দাশুড়িয়ায় বসবাস করতেন। গত সোমবার সকালে তিনি স্বামীর সঙ্গে বাবার বাড়ি সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার কুন্দল গ্রামের উদ্দেশে রওনা হন। তাঁর স্বামী তাঁকে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার রাজাপুরের একটি অটোরিকশায় তুলে দিয়ে ফিরে যান। রাতে মুক্তিয়ারা ইমোতে বড় জায়ের মুঠোফোনে চারটি ছবি পাঠান। ছবিতে দেখা যায়, গামছা দিয়ে ঢাকা তাঁর মৃতদেহ, মুখের মধ্যে গামছা ঢোকানো। মুখমণ্ডলে মারপিটের দাগ, সঙ্গে একটি খুদেবার্তা পাঠানো হয়। তাতে লেখা হয়, ‘তুই যেই হোস, এই মেয়েটার আত্মীয়দের বলে দিস, আমি ওকে খালাস করে দিয়েছি। আমায় ফালতু ছেলে বলে। ওর সব জেদ আজকে শেষ করেছি। বাড়ি যাচ্ছিল, তাই না? আসল বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম। লাশটা খুঁজে নিস। টা টা।’ ছবি ও খুদেবার্তার সুবাদে মুক্তিয়ারার বাবা, মা ও স্বামীর পরিবারের সবাই ধরে নেয় তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। মুক্তিয়ারার বাবা মঙ্গলবার জামাইয়ের বিরুদ্ধে বরাইগ্রাম থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
মুক্তিয়ারার স্বামী নিজেই বড়াইগ্রাম থানায় হাজির হয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং ঘটনাটি দ্রুত তদন্তের আবেদন করেন। পুলিশ তদন্তের শুরুতেই যে মুঠোফোন থেকে ইমোতে খুদেবার্তা ও ছবি পাঠানো হয়েছিল তা পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে গতকাল বুধবার রাতে ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলার দেবগ্রামের আবদুল মোতালেবের ছেলে সানোয়ার আহম্মেদ ওরফে আবিদকে (২৪) আটক করেন। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর বাড়ি থেকে পুলিশ মুক্তিয়ারাকে জীবিত উদ্ধার করে।

মুক্তিয়ারা পুলিশের কাছে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি প্রেম করে মামাতো ভাই আকমল হোসেনকে বিয়ে করেছিলেন। দুই বছর পার না হতেই তিনি মুঠোফোনে সানোয়ারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সর্বশেষ নিজেকে স্বামী ও তাঁর পরিবার থেকে আড়াল করার জন্য খুনের সাজানো নাটক করেন। তিনি ইতিমধ্যে আবিদের সঙ্গে বিয়ে করে সংসার করেছেন। তাঁর সঙ্গেই থাকতে চান।

বড়াইগ্রাম সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হারুণ অর রশিদ জানান, উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা মুক্তিয়ারা টেলিভিশনে ক্রাইম প্যাট্রল দেখে সুকৌশলে সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে অন্যের সঙ্গে সংসার করতে চেয়েছিলেন। এ ধরনের ঘটনা সমাজে সচারচর দেখা যায় না। তিনি ও তাঁর নতুন স্বামী প্রতারণা করেছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহা জানান, ওই নারীর পাঠানো ছবিগুলো দেখলে কারও পক্ষেই তা নকল বলা সম্ভব না। অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিজেকে লাশ হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। একইভাবে খুদেবার্তার কথাগুলোও বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে। তাই পুলিশ প্রথমে তাঁর বাবার মামলা নিয়েছে। পরে তদন্তের সময় প্রকৃত বিষয় জানার চেষ্টা করেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে তা উদ্‌ঘাটন করেছে। এ জন্য তিনি বড়াইগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সার্কেল অফিসার ও ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে ধন্যবাদ জানান।