বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৫ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

কে শোনে অবহেলিত হরিজন সম্প্রদায়ের নারীদের দু:খ গাঁথা কাহিনী?

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:০৭:৪৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৮ জুন ২০২০
  • ১৩৩ Time View

প্রভাষক মো.মাজেম আলী মলিন 
যে হাত দিয়ে ময়লা আবর্জনা পরিস্কার করে শ্রী বৃদ্ধি করছেন শহরের। সেই আবর্জনাই যেন চারপাশ থেকে চেপে ধরেছে ওদের জরাজীর্ণ ঘরগুলোকে। নিজ হাতে পুরো শহরকে পরম মমতায় শ্রীমান কর্ েরাখলেও ঠাঁই হয়নি তাদের বিশাল এই শহরের কোন স্থানে। শহরের বিশাল অট্রালিকার মাঝে ঢাঁকা পরেছে তাদের স্বপ্ন,বাসস্থান আর বুকে চেপে রাখা কষ্ট গুলো।
“মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভুতি কি মানুষ পেতে পারে না ও বন্ধু” ভুপেন হাজারিকার শত বছরের এই পুরাতন গানটাই গুনগুন করে গাইছিলেন নাটোরের গুরুদাসপুরের হরিজন সম্প্রদায়ের জুলি বাঁশফোর।
হরিজন সম্প্রদায় গুরুদাসপুর পৌরসভাসহ পুরো শহরের শ্রী বৃদ্বির জন্য কাজ করলেও নিজেদের ভাগ্যটাই যেন রয়ে গেছে শ্রীহীন। বাসা বিহীন ককিল পাখিরা যেমন ওদের মিষ্টি সুরে গান গেয়ে মাতোয়ারা করে রাখে গোটা প্রকৃতিকে। তেমনি জুলিরাও পুরো শহরটাকে পরিস্কার পরিচ্চন্ন করে রাখেন আপন মহিমায়। অথচ বসবাস করার এক চিলতে খাস জমিতে ঠাঁই পেলেও তাদের নেই কোন বাসযোগ্য ঘরবাড়ী। পৌরসভায় এদের অধিকাংশ লোক কর্মরত থাকলেও পৌর শহরের বাহিরে ১৯ শতাংশ খাস জমিতে গাদাগাদি করে বাস করছেন ২৪টি পরিবারের ১৪৪ জন হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ।
সরেজমিনে গুরুদাসপুর পৌরসভার হরিজন পল্লীতে গিয়ে দেখা যায়- পৌর সভার বাহিরে সামান্য একটু জায়গার উপরে ২৪ টি পরিবারের মোট ১৪৪ জন সদস্য কোন ঠাসা ঠাসি করে বসবাস করছেন। ওই সম্প্রদায়ের নারী শ্রমিক বেলী বাঁশফোর(৪২) জানান, ১০ ফুট বাই ১৪ ফুটের ছোট্ট একটি জরাজীর্ণ ঘরে স্বামী জিতেন বাঁশফোর (৪৮) ও দুই ছেলে বিপ্লব (২০) স্ত্রী মিনা (১৮) ৬ মাসের নাতি জোসেফ এবং ছোট ছেলে অন্তর(১১) এবং দুই মেয়ে পুঁজা ও পুর্নিমাসহ ৮ জন একত্রে বসবাস করছেন একই ঘরে। এক পরিবার খাটের ওপর, আরেক পরিবার নিচে, আর ঘরের সঙ্গে নামকাওয়াস্তে যে বারান্দা, সেখানে ঘুমায় জিতেন বাঁশফোর ও স্ত্রী বেলীরানী। বেলী আরো জানান- মান-ইজ্জত নিয়ে এভাবে বেঁচে থাকা যায় না। একই আয়তনের পাশের ঘরে স্ত্রী পুতলী বাঁশফোর(২৮)কে নিয়ে বসবাস করেন স্বামী প্রদীপ বাঁশফোর(৩২)। ওই একই ঘরে থাকে তার দুই মেয়ে ১৬ বছরের রেখা, ১২ বছরের দীপালী ও ৬ বছরের ছেলে দীপ এবং ৪ বছরের ছেলে শিপন।
মিন্টু বাঁশফোরের মেয়ে স্থানীয় ড. সামসুজ্জোহা সরকারী কলেজের দ্বাদ্বশ শ্রেণীতে পড়–য়া বৃষ্টি(১৭)জানান, হরিজন সম্প্রদায়ের নারীরা বেশী অবহেলিত। তাদের সমাজেও নারীদের অবস্থান সে ভাবে মূল্যায়িত হয়না। পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহনে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। তাদের শালিস-বিচারের জন্য পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় নারীদের কোনো অংশগ্রহনও নেই।
ওই পল্লীরই বাসিন্দা স্বদেশ বাঁশফোরের কলেজ পড়–য়া মেয়ে রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজের ছাত্রী অনিতা(১৭) বলেন, আমাদের অধিকার বলে কিছু নেই। অন্য সমাজের কাছেও নেই। এমন কি আমাদের সমাজেও নেই। আমরা সব অধিকার থেকে বঞ্চিত। তথা কথিত ‘সভ্য মানুষ’রা আমাদের অধিকার কেড়ে নিয়েছেন। আমাদের পুরুষরাও তাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলছেন।
জুলি বাঁশফোর দু:খ প্রকাশ করে বলেন, ‘রাতে মেঝেতে লম্বা বিছানা পাতি। ঘরগুলো ছোট তাই মেঝেতে শোয়ার সময় পাশ ফিরে ঘুমাতে পারি না। এতে মেয়েদের বেশী সমস্যা হয়। ষাটউর্ধো এক নারী বলেন, সেয়ানা (প্রাপ্ত বয়স্ক) ছেলে-মেয়েরা বাবা-মার সাথে একসাথে ঘুমাতে চায় না। রাত হলেই তাই চোখে জল নেমে আসে। এক কক্ষের ঘরে গরু-ছাগলের মত বসবাস করি আমরা। সরকার থেকে যদি আমাদের বাসস্থানের ব্যাবস্থা করে দিতেন তাহলে আমাদের কষ্টটা কিছুটা হলেও লাঘব হতো।
আর্থিক সংকটের বোঝা ঘারে নিয়েও পরিচ্ছন্নতার কাজে সব সময় সম্পৃক্ত থাকতে হয় গুরুদাসপুরের দলিত হরিজন সম্প্রদায়ের নারীদের। সব মিলিয়ে ভালো নেই নাটোরের গুরুদাসপুরের হরিজন পল্লীর নারীরা। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও বসে নেই। মা-মেয়ে, বৌ-শাশুড়ি, নাতনিসহ সকলে মিলে অর্থ উপার্জন করলেও পরিবারের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহনে তাদের ভূমিকা নেই। তারা জানান, সরকারি কিংবা বেসরকারি সংস্থার লোকজন কোনো দিন আমাদের সাথে নারীদের অধিকার বিষয়ে কোন আলোচনা করেননি।
গুরুদাসপুর উপাজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তমাল হোসেন জানান, একই ঘরে একাধীক সদস্য বাস করার বিষয়টি দুঃখজনক। আমরা তাদের জীবন মান উন্নয়োনের জন্য কাজ করবো। তাছাড়া এই গোষ্ঠিার সন্তান যারা লেখা পড়া করছে, উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের সার্বিক সহযোগীতা করা হবে।# প্রভাষক মো.মাজেম আলী মলিন

Tag :

কে শোনে অবহেলিত হরিজন সম্প্রদায়ের নারীদের দু:খ গাঁথা কাহিনী?

Update Time : ১১:০৭:৪৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৮ জুন ২০২০

প্রভাষক মো.মাজেম আলী মলিন 
যে হাত দিয়ে ময়লা আবর্জনা পরিস্কার করে শ্রী বৃদ্ধি করছেন শহরের। সেই আবর্জনাই যেন চারপাশ থেকে চেপে ধরেছে ওদের জরাজীর্ণ ঘরগুলোকে। নিজ হাতে পুরো শহরকে পরম মমতায় শ্রীমান কর্ েরাখলেও ঠাঁই হয়নি তাদের বিশাল এই শহরের কোন স্থানে। শহরের বিশাল অট্রালিকার মাঝে ঢাঁকা পরেছে তাদের স্বপ্ন,বাসস্থান আর বুকে চেপে রাখা কষ্ট গুলো।
“মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভুতি কি মানুষ পেতে পারে না ও বন্ধু” ভুপেন হাজারিকার শত বছরের এই পুরাতন গানটাই গুনগুন করে গাইছিলেন নাটোরের গুরুদাসপুরের হরিজন সম্প্রদায়ের জুলি বাঁশফোর।
হরিজন সম্প্রদায় গুরুদাসপুর পৌরসভাসহ পুরো শহরের শ্রী বৃদ্বির জন্য কাজ করলেও নিজেদের ভাগ্যটাই যেন রয়ে গেছে শ্রীহীন। বাসা বিহীন ককিল পাখিরা যেমন ওদের মিষ্টি সুরে গান গেয়ে মাতোয়ারা করে রাখে গোটা প্রকৃতিকে। তেমনি জুলিরাও পুরো শহরটাকে পরিস্কার পরিচ্চন্ন করে রাখেন আপন মহিমায়। অথচ বসবাস করার এক চিলতে খাস জমিতে ঠাঁই পেলেও তাদের নেই কোন বাসযোগ্য ঘরবাড়ী। পৌরসভায় এদের অধিকাংশ লোক কর্মরত থাকলেও পৌর শহরের বাহিরে ১৯ শতাংশ খাস জমিতে গাদাগাদি করে বাস করছেন ২৪টি পরিবারের ১৪৪ জন হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ।
সরেজমিনে গুরুদাসপুর পৌরসভার হরিজন পল্লীতে গিয়ে দেখা যায়- পৌর সভার বাহিরে সামান্য একটু জায়গার উপরে ২৪ টি পরিবারের মোট ১৪৪ জন সদস্য কোন ঠাসা ঠাসি করে বসবাস করছেন। ওই সম্প্রদায়ের নারী শ্রমিক বেলী বাঁশফোর(৪২) জানান, ১০ ফুট বাই ১৪ ফুটের ছোট্ট একটি জরাজীর্ণ ঘরে স্বামী জিতেন বাঁশফোর (৪৮) ও দুই ছেলে বিপ্লব (২০) স্ত্রী মিনা (১৮) ৬ মাসের নাতি জোসেফ এবং ছোট ছেলে অন্তর(১১) এবং দুই মেয়ে পুঁজা ও পুর্নিমাসহ ৮ জন একত্রে বসবাস করছেন একই ঘরে। এক পরিবার খাটের ওপর, আরেক পরিবার নিচে, আর ঘরের সঙ্গে নামকাওয়াস্তে যে বারান্দা, সেখানে ঘুমায় জিতেন বাঁশফোর ও স্ত্রী বেলীরানী। বেলী আরো জানান- মান-ইজ্জত নিয়ে এভাবে বেঁচে থাকা যায় না। একই আয়তনের পাশের ঘরে স্ত্রী পুতলী বাঁশফোর(২৮)কে নিয়ে বসবাস করেন স্বামী প্রদীপ বাঁশফোর(৩২)। ওই একই ঘরে থাকে তার দুই মেয়ে ১৬ বছরের রেখা, ১২ বছরের দীপালী ও ৬ বছরের ছেলে দীপ এবং ৪ বছরের ছেলে শিপন।
মিন্টু বাঁশফোরের মেয়ে স্থানীয় ড. সামসুজ্জোহা সরকারী কলেজের দ্বাদ্বশ শ্রেণীতে পড়–য়া বৃষ্টি(১৭)জানান, হরিজন সম্প্রদায়ের নারীরা বেশী অবহেলিত। তাদের সমাজেও নারীদের অবস্থান সে ভাবে মূল্যায়িত হয়না। পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহনে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। তাদের শালিস-বিচারের জন্য পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় নারীদের কোনো অংশগ্রহনও নেই।
ওই পল্লীরই বাসিন্দা স্বদেশ বাঁশফোরের কলেজ পড়–য়া মেয়ে রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজের ছাত্রী অনিতা(১৭) বলেন, আমাদের অধিকার বলে কিছু নেই। অন্য সমাজের কাছেও নেই। এমন কি আমাদের সমাজেও নেই। আমরা সব অধিকার থেকে বঞ্চিত। তথা কথিত ‘সভ্য মানুষ’রা আমাদের অধিকার কেড়ে নিয়েছেন। আমাদের পুরুষরাও তাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলছেন।
জুলি বাঁশফোর দু:খ প্রকাশ করে বলেন, ‘রাতে মেঝেতে লম্বা বিছানা পাতি। ঘরগুলো ছোট তাই মেঝেতে শোয়ার সময় পাশ ফিরে ঘুমাতে পারি না। এতে মেয়েদের বেশী সমস্যা হয়। ষাটউর্ধো এক নারী বলেন, সেয়ানা (প্রাপ্ত বয়স্ক) ছেলে-মেয়েরা বাবা-মার সাথে একসাথে ঘুমাতে চায় না। রাত হলেই তাই চোখে জল নেমে আসে। এক কক্ষের ঘরে গরু-ছাগলের মত বসবাস করি আমরা। সরকার থেকে যদি আমাদের বাসস্থানের ব্যাবস্থা করে দিতেন তাহলে আমাদের কষ্টটা কিছুটা হলেও লাঘব হতো।
আর্থিক সংকটের বোঝা ঘারে নিয়েও পরিচ্ছন্নতার কাজে সব সময় সম্পৃক্ত থাকতে হয় গুরুদাসপুরের দলিত হরিজন সম্প্রদায়ের নারীদের। সব মিলিয়ে ভালো নেই নাটোরের গুরুদাসপুরের হরিজন পল্লীর নারীরা। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও বসে নেই। মা-মেয়ে, বৌ-শাশুড়ি, নাতনিসহ সকলে মিলে অর্থ উপার্জন করলেও পরিবারের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহনে তাদের ভূমিকা নেই। তারা জানান, সরকারি কিংবা বেসরকারি সংস্থার লোকজন কোনো দিন আমাদের সাথে নারীদের অধিকার বিষয়ে কোন আলোচনা করেননি।
গুরুদাসপুর উপাজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তমাল হোসেন জানান, একই ঘরে একাধীক সদস্য বাস করার বিষয়টি দুঃখজনক। আমরা তাদের জীবন মান উন্নয়োনের জন্য কাজ করবো। তাছাড়া এই গোষ্ঠিার সন্তান যারা লেখা পড়া করছে, উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের সার্বিক সহযোগীতা করা হবে।# প্রভাষক মো.মাজেম আলী মলিন