কে এই নুপুর, যার মন্তব্যে অস্বস্তিতে সারা বিশ্ব

মোঃ মাজেম আলীমোঃ মাজেম আলী
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১০:৫১ AM, ১০ জুন ২০২২

আন্তর্জাতিক ডেস্ক.

হজরত মোহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে নুপুর শর্মার একটি বক্তব্যকে ঘিরে কয়েকদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। এ ঘটনায় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৬টি দেশ তার বিতর্কিত মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে। এ নিয়ে চরম অস্বস্তিতে বিজেপি সরকার। টিভির পর্দায় নেতাদের মুখ যাতে না দেখানো হয় তার ফরমান জারি করেছে ক্ষমতাসীন দলটি। কিন্তু কে এই নুপুর শর্মা, যার মন্তব্য ঘিরে উত্তাল গোটা বিশ্ব।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন দল বিজেপির মুখপাত্র ছিলেন নুপুর। বিতর্কিত মন্তব্যের পর অবশ্য আপাতত সেই পদ হারিয়েছেন তিনি।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্ত হিন্দু কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করা নুপুর পরে আইনের ডিগ্রিও অর্জন করেন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স থেকে আইনে স্নাতকোত্তরও করেছেন তিনি। কলেজে পড়াকালীনই রাজনীতিতে হাতেখড়ি নুপুরের। সঙ্ঘ পরিবারের ছাত্র সংগঠন এবিভিপির নেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ হয় তার। ২০০৮ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সভানেত্রী হন নুপুর শর্মা।

২০০৮ সালের নভেম্বরে সংসদ হামলায় অভিযুক্ত এসএআর গিলানিকে হেনস্থা করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পরে অবশ্য আদালতে খালাস পেয়ে যান তিনি। সংসদ হামলায় অভিযুক্ত অধ্যাপক গিলানির মুখে থুতু ছিটিয়েছিলেন নুপুরের সঙ্গী। সেই সময়ই খবরের শিরোনামে উঠে আসেন এই নুপুর।

ওই বছরের ৬ নভেম্বর একটি আলোচনা সভায় অংশ নিয়েছিলেন এসএআর গিলানি। এবিভিপির কর্মীদের নিয়ে সভাস্থলে পৌঁছান নুপুর। শুরু হয় ভাঙচুর। নুপুরকে দেখা যায়, বিভিন্নভাবে গিলানিকে অপদস্ত করতে। সে সময় তার এক সঙ্গী গিলানির মুখে থুতু ছেটান। এরপরেই পদোন্নতি। ভারতীয় জনতা পার্টির যুব মোর্চার জাতীয় কর্মসমিতির সদস্য হন নুপুর। দিল্লি বিজেপির রাজ্য কর্মসমিতির সদস্যও হন তিনি। পরে বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র হন।

২০১৫ সালে দিল্লি বিধানসভায় নয়াদিল্লি বিধানসভা কেন্দ্রে আপ প্রধান অরবিন্দ কেজরীবালের বিরুদ্ধে প্রার্থী হন নুপুর। যদিও ৩১ হাজার ৫৮৩ ভোটে কেজরীর কাছে হেরে যান তিনি। ২০১৭ সালে দিল্লি বিজেপির মুখপাত্র হন নুপুর শর্মা। বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য নুপুরের বিরুদ্ধে মহারাষ্ট্র, হায়দরাবাদে একাধিক মামলা হয়েছে ইতোমধ্যেই। মুম্বাই পুলিশ ওই অভিযোগের ভিত্তিতে এখনো কোনো ব্যবস্থা না নিলেও সোমবার (৬ জুন) নুপুরকে সমন জারি করে।

নুপুর-বিতর্কে চুপ দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কয়েকটি সরকারি অনুষ্ঠানে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য রেখেছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যেখানে ভারতের ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তা নিয়ে একেবারেই ‘নীরব’ মোদি
মুসলিম দেশগুলো ভারতের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী কেন চুপ তা নিয়ে সরব বিরোধীরা। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর কথায়, ‘ঘরে ভাঙন ধরায় বহির্বিশ্বের কাছেও দুর্বল হয়ে পড়েছে ভারত।’

প্রসঙ্গত, নুপুর শর্মা সম্প্রতি এক টেলিভিশন বিতর্কে মহনবীকে (সা.) নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। আর দলের দিল্লি শাখার মিডিয়া ইউনিটের প্রধান নবীন কুমার জিন্দাল এ বিষয়ে টুইটারে একটি পোস্ট দেন।

তাদের মন্তব্য, বিশেষ করে নুপুর শর্মার কথা ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে বেশ ক্ষুব্ধ করে। নুপুরের এক মন্তব্যের পরই উত্তরপ্রদেশের কানপুরে শুরু হয়ে যায় উত্তেজনা। প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন বহু মানুষ। যদিও নুপুর শর্মা ও নবীন কুমার জিন্দাল এরই মধ্যে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন। অন্যদিকে, নুপুর শর্মাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং নবীন কুমার জিন্দালকে দল থেকেই বহিষ্কার করা হয়েছে। তবুও চলছে বিতর্ক।

একই সঙ্গে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের কারণে ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বরখাস্ত মুখপাত্র নূপুর শর্মা, নভিন জিন্দাল, সাংবাদিক সাবা নকভি ও পুরোহিত স্বামী যতি নরসিংহানন্দের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে।

সম্প্রতি ভারতের স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল টাইমস নাউ ওয়ান-এ মহানবী (সা.) ও তার স্ত্রী আয়েশাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন বিজেপির মুখপাত্র নূপুর শর্মা। পরে নূপুর শর্মার ওই মন্তব্য সমর্থন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটারে একটি পোস্ট দেন দলটির দিল্লি শাখার মিডিয়া ইউনিটের প্রধান নবীন কুমার জিন্দাল।

এ ঘটনার পরপরই ভারতের স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশ। ভারতীয় পণ্য বয়কটের ডাক দেয় কয়েকটি আরব দেশ। এমনকি কুয়েতের কিছু দোকানের তাক থেকে ভারতীয় পণ্য সরিয়ে ফেলা হয়।

রোববার (৫ জুন) আরব দেশগুলোতে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতদের ডেকে পাঠিয়ে এর প্রতিবাদও জানানো হয়। ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্যের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন অনেকে। এ ছাড়া মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানায় ইরান, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া,  পাকিস্তান মুসলিম দেশসহ বিভিন্ন দেশ।

মুসলিম বিশ্ব, বিশেষ করে কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, আমিরাত ও বাহরাইনের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ক্ষোভের মুখে নড়েচড়ে বসে মোদি সরকার। রোববার মুখপাত্র নূপুর শর্মাকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বরখাস্ত করে বিজেপি। আর নবীন কুমার জিন্দালকে বহিষ্কার করা হয়।

বিষয়টি নিয়ে বিজেপির কঠোর সমালোচনা করেন ভারতের হায়দরাবাদভিত্তিক রাজনৈতিক দল এআইএমআইএম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। তিনি বলেন, কাতার, সৌদি আরব, বাহরাইনের কড়া প্রতিক্রিয়ার কারণে বিজেপি নূপুর শর্মার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে। আসাদউদ্দিন আরও বলেন, আমরা যখন বলেছিলাম নূপুর শর্মার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে, তখন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ঘটনার ১০ দিন পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নূপুর শর্মাকে সাসপেন্ড করতে বলেন।

এআইএমআইএম প্রধান আসাদউদ্দিনের এ মন্তব্যকে ’উসকানিমূলক’ বলে মনে করছে দিল্লি পুলিশ। এ মন্তব্যের জন্য তার বিরুদ্ধে করা হয় এফআইআর। এফআইআরের কারণ হিসেবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা ও ভুল তথ্য ঠেকাতেই এ সিদ্ধান্ত।

আসাদউদ্দিন ছাড়াও স্বামী নরসিংহানন্দ, শাদাব চৌহান, সাবা নকবি, মৌলানা মুফতি নাদিম, আবদুল রহমান, গুলজার আনসারি, অনিল কুমার মীনা, পূজা শকুন পান্ডে প্রমুখ ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে করা এফআইআরে বিদ্বেষমূলক বার্তা ছড়ানো, উসকানি দেয়া, অশান্তির পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।

এদিকে নূপুর শর্মার বিতর্কিত ধর্মীয় মন্তব্যের জন্য ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) 153A, 153B, এবং 295 (A) ধারায় অম্বরনাথ থানায় অভিযোগ করেছে সর্বভারতীয় প্রগতিশীল মুসলিম কল্যাণ কমিটি।

নূপুর শর্মার বিরুদ্ধে একই আইনি ধারায় আরও বেশ কয়েকটি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, নূপুর শর্মা ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে অবমাননাকর ও মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন এবং মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত করেছেন। তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

আপনার মতামত লিখুন :