চাকরি করেন বাংলাদেশে , সুকৌশলে বেতন নেন ভারতে বসে !

মোঃ মাজেম আলীমোঃ মাজেম আলী
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৪:৫৩ PM, ০৮ অগাস্ট ২০২২

মোঃহারুনার রশীদ হারুন বেড়া পাবনা প্রতিনিধিঃ প্রায় ৫ বছর আগে বসবাসের উদ্দেশ্যে ভারতে বাড়ি করে বসবাস শুরু করেছেন পাবনার বেড়া উপজেলার মাশুন্দিয়া-ভবানীপুর কে.জে.বি ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক বিশ্বনাথ দত্ত। স্ত্রী সন্তানসহ সপরিবারে বসবাস করছেন ভারতের কলকাতায়। কয়েক বছর যাবত তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোন প্রকার হাজিরা ছাড়াই বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সকল সুবিধাই ভোগ করে আসছেন শিক্ষক বিশ্বনাথ দত্ত।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোন্নাফ সরকার বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গণিত বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক বিশ্বনাথ দত্ত প্রায় ৫ বছর আগে সপরিবারে ভারতে চলে যান। মাঝেমধ্যে তিনি ভারত থেকে দেশে এসে কলেজে হাজিরা দিয়ে যান। তবে অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে গত এক বছরের অধিক সময় ধরে বিনা ছুটিতে ভারতে অবস্থান করায় তার স্বাক্ষর জাল করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুস ছালাম বিশ্বাস ও বিশ্বনাথ দত্তের ভাই সুনিল দত্তের যোগসাজসে নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন।

বিশ্বনাথ দত্তের চাকরির ইনডেক্স নং-৪০৩৩৮৪, সোনালী ব্যাংক, বেড়া শাখা, পাবনার ব্যাংক হিসাব নং-০০২০৬৩২৫১। যা ব্যাংকে গিয়ে খোঁজ নিয়ে সত্যতা পাওয়া গেছে ।

লিখিত অভিযোগের অনুলিপি থেকে জানা যায়, বিশ্বনাথ দত্ত তার বড় ভাই সুনিল দত্তের কাছে ব্যাংকের চেকবই স্বাক্ষর করে রেখে গেছেন। প্রতি মাসে বেতন বইতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিজেই বিশ্বনাথ দত্তের নামের ঘরে স্বাক্ষর করে ব্যাংক হিসাবে জমা করার পরে বিশ্বনাথ দত্তের ভাই সুনিল দত্তকে দিয়ে ব্যাংক থেকে সমুদয় টাকা মাসিক ৪০,৩৫৩/-উত্তোলন করে অর্ধেক টাকা নিজে নিয়ে নেন। বাঁকি টাকা ওই শিক্ষকের ভাইকে দেন। শিক্ষকদের দাবি বেতনের অর্থ গ্রহণের বিনিময়ে ভারতে অবস্থান করেও বাংলাদেশে চাকরি করাকে সহজ করে দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ।

কোনো কাজ না করেই বেতনভাতা তুলে নিচ্ছেন বছরের পর বছর। ভোগ করছেন সরকারের উৎসবভাতা ও বোনাসসহ সুবিধাদি। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

অভিযোগকারী শিক্ষক মন্নাফ সরকারের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পুরো ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘বিশ্বনাথ দত্ত সপরিবারে ভারতে থাকেন। একবছর হলো তিনি কলেজে আসেন না। অথচ কলেজ থেকে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন ঠিকই। হাজিরা খাতায় লাল কালি দিয়ে অনুপস্থিত লেখা আছে। বিভিন্ন অজুহাতে অনুপস্থিত দেখানো হয় প্রায় এক বছর ধরে। বিশ্বনাথ দত্তের বেতনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুস ছালাম বিশ্বাস নিজেই তার স্বাক্ষর দিয়ে দেন। আর আমরা শুনেছি বিশ্বনাথ তার ভাইয়ের কাছে সোনালী ব্যাংকের চেক বইয়ে স্বাক্ষর করে রেখে গেছেন এবং তিনি ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করেন।’

অভিযোগের বিষয়ে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুস ছালাম বিশ্বাসের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। একপর্যায়ে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বিভিন্ন অজুহাতে প্রতিবেদকের সাথে কথা বলতে রাজী হননি। একবার ফোন ধরে বলেন, আমি মিটিংয়ে আছি পরে কথা বলছি। পরে ফোন দিলে বলেন, আমি গাড়িতে আছি পরে কথা বলছি। তবে তার পক্ষে সুপারিশের জন্য স্থানীয় কয়েকজন নেতা এ প্রতিবেদককে মুঠেফোনে প্রতিবেদন না লেখার কথা বলেন।

সোনালী ব্যাংক বেড়া শাখায় সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, বিশ্বনাথ দত্তের প্রতি মাসের বেতন প্রতি মাসেই একাউন্টে জমা হচ্ছে এবং তা উত্তোলনও হচ্ছে।

এ ব্যাপারে কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি আব্দুল আজিজ খানের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি ঐ কলেজের নতুন সভাপতি হয়েছি। তবে বিশ্বনাথের বিষয়ে শুনেছি তিনি অসুস্থতার অজুহাতে ভারতে থাকেন। আমি সভাপতি হবার পর কলেজে তিন চারটি মিটিং করেছি। তার সাথে আমার একবারও দেখা হয়নি। কলেজের সর্ব শেষ মিটিংয়ে ১৫ আগস্ট তাকে উপস্থিত থাকার কথা বলেছি। ১৫ আগস্টে যদি উপস্থিত না হন তাহলে আমি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব। যারা তাকে এই অবৈধকাজে সহায়তা করছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কলেজের কয়েকজন শিক্ষক বলেন, ‘কলেজের অধ্যক্ষ এবং পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির স্বাক্ষর ছাড়া বেতনই হয় না। তাহলে কীভাবে এতদিন বিশ্বনাথ দত্তের বেতন হয়? এই দুর্নীতিতে সবারই হাত আছে। বড় বিষয় হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী কোন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এক বছরের বেশি থাকার নিয়ম নেই। অথচ আব্দুস ছালাম বিশ্বাস বিগত তিন বছর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এ বিষয়ে জানার জন্য সহকারী অধ্যাপক বিশ্বনাথ দত্ত ও তার ভাই সুনিল দত্তের সঙ্গে কোনভাবেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

আপনার মতামত লিখুন :