বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

কি ঘটেছিলো হাবিল-কাবিলের কুরবানি নিয়ে

মাহমুদ হাসান ফাহিম.

কুরবানি শব্দটি ‘কুরবুন’ থেকে নির্গত। যার অর্থ নৈকট্য, সান্নিধ্য, উৎসর্গ, কুরবানি। নিজের প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় উৎসর্গ করা। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম কুরবানি বা আল্লাহর নামে কিভাবে উৎসর্গ করা হয়েছিল তা এখানে আলোচনা করা হয়েছে।

পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম কুরবানি ছিল মানবজাতির আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কুরবানি। সেখান থেকেই কুরবানির প্রচলন শুরু হয়। পবিত্র কুরআনে বিশদভাবে সে ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আদমের দুই ছেলের কাহিনি আপনি তাদেরকে যথাযথভাবে শোনান। যখন তারা কুরবানি করেছিল, তাদের একজনের কুরবানি কবুল করা হলো এবং অন্যজনেরটা প্রত্যাখ্যান করা হলো। সে বলল, অবশ্যই আমি তোমাকে হত্যা করব। অন্যজন বলল, আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকিদের পক্ষ থেকেই কবুল করেন। (সূরা মায়িদা : ২৭)।

হজরত আদম ও হাওয়া (আ.)-এর মাধ্যমেই পৃথিবীতে বংশ বিস্তার আরম্ভ হয়। হাওয়া (আ.) প্রতি গর্ভ থেকে একটি পুত্র সন্তান ও একটি কন্যাসন্তান, এরূপ যমজ সন্তান জন্মগ্রহণ করত। তখন শরিয়তের বিধান ছিল, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পর সহোদর ভাই বোন। তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম। কিন্তু পরবর্তী গর্ভের পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভে জন্মগ্রহণকারিণী কন্যা সহোদরা বোন নয়। তাদের মধ্যে পরস্পর বিবাহবন্ধন বৈধ।

ঘটনাক্রমে কাবিলের সহোদরা বোন ছিল পরমাসুন্দরী এবং হাবিলের সহজাত ছিল অপেক্ষাকৃত কম সুন্দরী। বিয়ের সময় হলে নিয়মানুযায়ী হাবিলের সহজাত বোন কাবিলের ভাগে পড়ে। এতে কাবিল অসন্তুষ্ট হয়ে হাবিলের শত্রু হয়ে যায়। সে জিদ ধরে বলল, আমার সহজাত বোনকে আমার সঙ্গে বিবাহ দিতে হবে। আদম (আ.) তার শরিয়তের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কাবিলের আবদার প্রত্যাখ্যান করলেন। কাবিল তার সিদ্ধান্তে আটল। সে তার বক্তব্য থেকে সরে আসতে নারাজ।

এতে উভয়ের মাঝে মতভেদ দেখা দেয়। এ মতভেদ নিরসন করার উদ্দেশ্যে হজরত আদম (আ.) বললেন, তোমরা উভয়েই আল্লাহর নামে কুরবানি পেশ কর। যার কুরবানি গৃহীত হবে, সে ওই কন্যাকে বিবাহ করতে পারবে।

আদম (আ.) নিশ্চিত ছিলেন, যে সৎ পথে আছে, তার কুরবানিই গৃহীত হবে। তখন কুরবানি গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে কুরবানিকে ভস্মীভূত করে ফেলত। যার কুরবানি ভস্ম করত না, তা প্রত্যাখ্যাত হিসাবে গণ্য হতো।

হাবিল ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি লালন-পালন করত। তাই সে একটা উৎকৃষ্ট দুম্বা কুরবানি হিসাবে পেশ করল। আর কাবিল কৃষিকাজ করত। সে কিছু শস্য, গম ইত্যাদি কুরবানির জন্য পেশ করল। নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগুন এসে হাবিলের কুরবানিটি জ্বালিয়ে দিল এবং কাবিলের কুরবানি যেমন ছিল, তেমনই পড়ে রইল। অকৃতকার্য হলো কাবিল। তার কুরবানি গৃহীত হয়নি হাবিলেরটা গৃহীত হয়েছে। কবুল হয়েছে।

নিয়ম মাফিক কাবিল তার সহোদরা বোনকে বিবাহ করতে পারবে না। ফলে তার দুঃখ ও ক্ষোভ আরও বেড়ে গেল। আত্মসংবরণ করতে না পেরে প্রকাশ্যে হাবিলকে হত্যার হুমকি দিল। বলল, অবশ্যই আমি তোমাকে হত্যা করে ফেলব। হাবিল মার্জিত ও নীতিবাক্য উচ্চারণ করে সহানুভূতি প্রকাশ করে বলল, আল্লার নিয়ম তো এই, তিনি আল্লাহভীরু মুত্তাকিদের কর্মই গ্রহণ করেন। তুমি আল্লাহভীতি অবলম্বন করলে তোমার কুরবানিও গৃহীত হতো। এটাই ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম কুরবানি। (তাফসিরে ইবনে কাসির, সূরা মায়িদাহ, ২৭তম আয়াতের তাফসির দ্র.ব্য.)।

লেখক: শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদরাসা কমপ্লেক্স টঙ্গী, গাজীপুর।

Tag :
About Author Information

Daily Banalata

Popular Post

কি ঘটেছিলো হাবিল-কাবিলের কুরবানি নিয়ে

Update Time : ০৬:২৮:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ জুন ২০২৪

মাহমুদ হাসান ফাহিম.

কুরবানি শব্দটি ‘কুরবুন’ থেকে নির্গত। যার অর্থ নৈকট্য, সান্নিধ্য, উৎসর্গ, কুরবানি। নিজের প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় উৎসর্গ করা। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম কুরবানি বা আল্লাহর নামে কিভাবে উৎসর্গ করা হয়েছিল তা এখানে আলোচনা করা হয়েছে।

পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম কুরবানি ছিল মানবজাতির আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কুরবানি। সেখান থেকেই কুরবানির প্রচলন শুরু হয়। পবিত্র কুরআনে বিশদভাবে সে ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আদমের দুই ছেলের কাহিনি আপনি তাদেরকে যথাযথভাবে শোনান। যখন তারা কুরবানি করেছিল, তাদের একজনের কুরবানি কবুল করা হলো এবং অন্যজনেরটা প্রত্যাখ্যান করা হলো। সে বলল, অবশ্যই আমি তোমাকে হত্যা করব। অন্যজন বলল, আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকিদের পক্ষ থেকেই কবুল করেন। (সূরা মায়িদা : ২৭)।

হজরত আদম ও হাওয়া (আ.)-এর মাধ্যমেই পৃথিবীতে বংশ বিস্তার আরম্ভ হয়। হাওয়া (আ.) প্রতি গর্ভ থেকে একটি পুত্র সন্তান ও একটি কন্যাসন্তান, এরূপ যমজ সন্তান জন্মগ্রহণ করত। তখন শরিয়তের বিধান ছিল, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পর সহোদর ভাই বোন। তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম। কিন্তু পরবর্তী গর্ভের পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভে জন্মগ্রহণকারিণী কন্যা সহোদরা বোন নয়। তাদের মধ্যে পরস্পর বিবাহবন্ধন বৈধ।

ঘটনাক্রমে কাবিলের সহোদরা বোন ছিল পরমাসুন্দরী এবং হাবিলের সহজাত ছিল অপেক্ষাকৃত কম সুন্দরী। বিয়ের সময় হলে নিয়মানুযায়ী হাবিলের সহজাত বোন কাবিলের ভাগে পড়ে। এতে কাবিল অসন্তুষ্ট হয়ে হাবিলের শত্রু হয়ে যায়। সে জিদ ধরে বলল, আমার সহজাত বোনকে আমার সঙ্গে বিবাহ দিতে হবে। আদম (আ.) তার শরিয়তের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কাবিলের আবদার প্রত্যাখ্যান করলেন। কাবিল তার সিদ্ধান্তে আটল। সে তার বক্তব্য থেকে সরে আসতে নারাজ।

এতে উভয়ের মাঝে মতভেদ দেখা দেয়। এ মতভেদ নিরসন করার উদ্দেশ্যে হজরত আদম (আ.) বললেন, তোমরা উভয়েই আল্লাহর নামে কুরবানি পেশ কর। যার কুরবানি গৃহীত হবে, সে ওই কন্যাকে বিবাহ করতে পারবে।

আদম (আ.) নিশ্চিত ছিলেন, যে সৎ পথে আছে, তার কুরবানিই গৃহীত হবে। তখন কুরবানি গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে কুরবানিকে ভস্মীভূত করে ফেলত। যার কুরবানি ভস্ম করত না, তা প্রত্যাখ্যাত হিসাবে গণ্য হতো।

হাবিল ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি লালন-পালন করত। তাই সে একটা উৎকৃষ্ট দুম্বা কুরবানি হিসাবে পেশ করল। আর কাবিল কৃষিকাজ করত। সে কিছু শস্য, গম ইত্যাদি কুরবানির জন্য পেশ করল। নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগুন এসে হাবিলের কুরবানিটি জ্বালিয়ে দিল এবং কাবিলের কুরবানি যেমন ছিল, তেমনই পড়ে রইল। অকৃতকার্য হলো কাবিল। তার কুরবানি গৃহীত হয়নি হাবিলেরটা গৃহীত হয়েছে। কবুল হয়েছে।

নিয়ম মাফিক কাবিল তার সহোদরা বোনকে বিবাহ করতে পারবে না। ফলে তার দুঃখ ও ক্ষোভ আরও বেড়ে গেল। আত্মসংবরণ করতে না পেরে প্রকাশ্যে হাবিলকে হত্যার হুমকি দিল। বলল, অবশ্যই আমি তোমাকে হত্যা করে ফেলব। হাবিল মার্জিত ও নীতিবাক্য উচ্চারণ করে সহানুভূতি প্রকাশ করে বলল, আল্লার নিয়ম তো এই, তিনি আল্লাহভীরু মুত্তাকিদের কর্মই গ্রহণ করেন। তুমি আল্লাহভীতি অবলম্বন করলে তোমার কুরবানিও গৃহীত হতো। এটাই ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম কুরবানি। (তাফসিরে ইবনে কাসির, সূরা মায়িদাহ, ২৭তম আয়াতের তাফসির দ্র.ব্য.)।

লেখক: শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদরাসা কমপ্লেক্স টঙ্গী, গাজীপুর।