বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

লিবিয়ায় জিম্মি বাংলাদেশী ৪ যুবক উদ্ধার, পরিবারে আনন্দের জোয়ার

লিবিয়ায় থাকা নাটোরের গুরুদাসপুরের চার জন প্রবাসী শ্রমিককে জিম্মি করে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছে ৪০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছিলো। গত শনিবার ৮ জুন দৈনিক ভোরের কাগজ ও ডেইলী অবজারভার পত্রিকায় “গুরুদাসপুরের চার যুবক লিবিয়ায় জিম্মি” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদটি নজরে আসে সরকারের উর্দ্ধতন কর্তপক্ষের। এরপর বাংলাদেশ সময় রোববার সাড়ে ১১টায় লিবিয়া’র স্থানীয় প্রশাসন জিম্মি থাকা প্রবাসী চার জন শ্রমীককে উদ্ধার করেন। এসময় অপহরণকারীদের মধ্যে লিবিয়া’র দুই জন ও বাংলাদেশের দুই জনসহ মোট চারজনকে আটক করে লিবিয়া’র স্থানীয় প্রশাসন। প্রবাসীদের পরিবারের বরাত দিয়ে গুরুদাসপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ উজ্জল হোসেন জিম্মি থাকা প্রবাসীদের উদ্ধার ও অপহরণকারী চারজনকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

প্রবাসী সোহানের মা রুলি বেগম জানান,‘গত ২ জুন তার ছেলেসহ প্রতিবেশী আরো তিন জন প্রবাসী যুবককে লিবিয়ায় অপহরণ করা হয়। তারপর নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে চার জনের জন্য ৪০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চায় অপহরণকারীরা। সন্তানদের এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে পরেছিলেন তিনিসহ তিন প্রবাসীর পরিবার। এরপর গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। রোববার সকাল সাড়ে দশটার দিকে অপহরণকারীদের দেওয়ার জন্য চার পরিবারের পক্ষ থেকে চার লাখ টাকা জোগার করে গুরুদাসপুরের একটি স্থানীয় বেসরকারী ব্যাংকের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন তারা। এরপর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে লিবিয়া থেকে তার মোবাইলের ইম্যু নম্বরে তার ছেলে সোহান একটি ভিডিও বার্তা পাঠান। সেখানে সোহান বলে,“আব্বা আমাদের লিবিয়ার স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনী অপহরণকারীদের কাছ থেকে উদ্ধার করেছে। তোমরা চিন্তা করো না। আমরা এখন নিরাপদে আছি।” এ কথা শোনার পরপরই ব্যাংকে না গিয়ে টাকা নিয়ে বাড়িতে ফিরেন আসেন এবং প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ধার নেওয়া টাকা সকলেই ফেরৎ দেন। এমন খুসির খবরে প্রাণ ফিরে পেয়েছে সকল প্রবাসীর পরিবার ও স্বজনদেও মধ্যে। তিনি সরকার, গণমাধ্যম ও লিবিয়া প্রশাসনের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন।’

আরো এক প্রবাসী বিদ্যুৎ এর মা বিউটি বেগম জানান,‘তার স্বামী অনেক পূর্বে থেকেই লিবিয়ায় শ্রমীক হিসাবে কাজ করতো। পরবর্তীতে তার ছেলেসহ প্রতিবেশী আরো তিন যুবক এক সঙ্গে লিবিয়ায় যান শ্রমিক হিসাবে। তার ছেলেও অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। অপহরণ হওয়ার পর থেকেই পরিবার ও স্বজনদের আহাজারী থামছিলো না। রোববার সকাল সাড়ে ১১টার সময় তার স্বামী তাকে কল করে জানায় তার ছেলে সহ চারজনকেই লিবিয়ার স্থানীয় প্রশাসন উদ্ধার করেছে। রাতের মধ্যেই তার স্বামীর কাছে হয়তো ফিরে যাবে তার সন্তানসহ প্রতিবেশীদের সন্তানরাও।’
গুরুদাসপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ উজ্জল হোসেন জানান,‘ঘটনার পর থেকেই তিনি এ বিষয়ে তার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছিলেন। নাটোর পুলিশ সুপারের নির্দেশে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত পরিবারগুলোর সাথে থানা পুলিশ সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছে।’

উল্লেখ্য যে, প্রায় দুই বছর পূর্বে বিয়াঘাট চরপাড়া গ্রামের মোঃ শাজাহান প্রাং এর ছেলে মোঃ সোহান প্রাং (২০), মোঃ তয়জাল শেখের ছেলে মোঃ সাগর হোসেন (২৪), মৃত-শুকুর আলীর ছেলে নাজিম আলী (৩২) ও ইনামুল ইসলামের ছেলে মোঃ বিদ্যুৎ হোসেন (২৬) লিবিয়াতে কাজের জন্য যান। সকলের পরিবার থেকেই জমি বন্দক, গরু বিক্রি ও ঋণ করে সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। দুই বছরে কাজ করে উপার্জিত প্রতি মাসে ১৫-২০ হাজার করে পাঠিয়েছেন। অভাবের সংসারেও হতদরিদ্র পরিবারগুলো প্রবাসী সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলো। প্রবাস থেকে উপার্জিত টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন ভেবেই ঋণ করে ছেলেদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন।

Tag :
About Author Information

Daily Banalata

Popular Post

লিবিয়ায় জিম্মি বাংলাদেশী ৪ যুবক উদ্ধার, পরিবারে আনন্দের জোয়ার

Update Time : ০৫:০২:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ জুন ২০২৪

লিবিয়ায় থাকা নাটোরের গুরুদাসপুরের চার জন প্রবাসী শ্রমিককে জিম্মি করে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছে ৪০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছিলো। গত শনিবার ৮ জুন দৈনিক ভোরের কাগজ ও ডেইলী অবজারভার পত্রিকায় “গুরুদাসপুরের চার যুবক লিবিয়ায় জিম্মি” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদটি নজরে আসে সরকারের উর্দ্ধতন কর্তপক্ষের। এরপর বাংলাদেশ সময় রোববার সাড়ে ১১টায় লিবিয়া’র স্থানীয় প্রশাসন জিম্মি থাকা প্রবাসী চার জন শ্রমীককে উদ্ধার করেন। এসময় অপহরণকারীদের মধ্যে লিবিয়া’র দুই জন ও বাংলাদেশের দুই জনসহ মোট চারজনকে আটক করে লিবিয়া’র স্থানীয় প্রশাসন। প্রবাসীদের পরিবারের বরাত দিয়ে গুরুদাসপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ উজ্জল হোসেন জিম্মি থাকা প্রবাসীদের উদ্ধার ও অপহরণকারী চারজনকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

প্রবাসী সোহানের মা রুলি বেগম জানান,‘গত ২ জুন তার ছেলেসহ প্রতিবেশী আরো তিন জন প্রবাসী যুবককে লিবিয়ায় অপহরণ করা হয়। তারপর নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে চার জনের জন্য ৪০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চায় অপহরণকারীরা। সন্তানদের এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে পরেছিলেন তিনিসহ তিন প্রবাসীর পরিবার। এরপর গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। রোববার সকাল সাড়ে দশটার দিকে অপহরণকারীদের দেওয়ার জন্য চার পরিবারের পক্ষ থেকে চার লাখ টাকা জোগার করে গুরুদাসপুরের একটি স্থানীয় বেসরকারী ব্যাংকের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন তারা। এরপর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে লিবিয়া থেকে তার মোবাইলের ইম্যু নম্বরে তার ছেলে সোহান একটি ভিডিও বার্তা পাঠান। সেখানে সোহান বলে,“আব্বা আমাদের লিবিয়ার স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনী অপহরণকারীদের কাছ থেকে উদ্ধার করেছে। তোমরা চিন্তা করো না। আমরা এখন নিরাপদে আছি।” এ কথা শোনার পরপরই ব্যাংকে না গিয়ে টাকা নিয়ে বাড়িতে ফিরেন আসেন এবং প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ধার নেওয়া টাকা সকলেই ফেরৎ দেন। এমন খুসির খবরে প্রাণ ফিরে পেয়েছে সকল প্রবাসীর পরিবার ও স্বজনদেও মধ্যে। তিনি সরকার, গণমাধ্যম ও লিবিয়া প্রশাসনের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন।’

আরো এক প্রবাসী বিদ্যুৎ এর মা বিউটি বেগম জানান,‘তার স্বামী অনেক পূর্বে থেকেই লিবিয়ায় শ্রমীক হিসাবে কাজ করতো। পরবর্তীতে তার ছেলেসহ প্রতিবেশী আরো তিন যুবক এক সঙ্গে লিবিয়ায় যান শ্রমিক হিসাবে। তার ছেলেও অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। অপহরণ হওয়ার পর থেকেই পরিবার ও স্বজনদের আহাজারী থামছিলো না। রোববার সকাল সাড়ে ১১টার সময় তার স্বামী তাকে কল করে জানায় তার ছেলে সহ চারজনকেই লিবিয়ার স্থানীয় প্রশাসন উদ্ধার করেছে। রাতের মধ্যেই তার স্বামীর কাছে হয়তো ফিরে যাবে তার সন্তানসহ প্রতিবেশীদের সন্তানরাও।’
গুরুদাসপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ উজ্জল হোসেন জানান,‘ঘটনার পর থেকেই তিনি এ বিষয়ে তার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছিলেন। নাটোর পুলিশ সুপারের নির্দেশে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত পরিবারগুলোর সাথে থানা পুলিশ সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছে।’

উল্লেখ্য যে, প্রায় দুই বছর পূর্বে বিয়াঘাট চরপাড়া গ্রামের মোঃ শাজাহান প্রাং এর ছেলে মোঃ সোহান প্রাং (২০), মোঃ তয়জাল শেখের ছেলে মোঃ সাগর হোসেন (২৪), মৃত-শুকুর আলীর ছেলে নাজিম আলী (৩২) ও ইনামুল ইসলামের ছেলে মোঃ বিদ্যুৎ হোসেন (২৬) লিবিয়াতে কাজের জন্য যান। সকলের পরিবার থেকেই জমি বন্দক, গরু বিক্রি ও ঋণ করে সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। দুই বছরে কাজ করে উপার্জিত প্রতি মাসে ১৫-২০ হাজার করে পাঠিয়েছেন। অভাবের সংসারেও হতদরিদ্র পরিবারগুলো প্রবাসী সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলো। প্রবাস থেকে উপার্জিত টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন ভেবেই ঋণ করে ছেলেদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন।