সন্তর্পণে পুষে রাখা অনুভূতিগাঁথা -পর্ব-৪

Md MagemMd Magem
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৩:২৫ AM, ০৬ নভেম্বর ২০২০

প্রভাষক নাসরিন সুলতানা রুমা
১৯৮৮ সালের বন্যা।চারিদিকে থইথই পানি।নদীর পানি উপচে পরে উঁচু জায়গাগুলো ভাসিয়ে দিল।মাটির ঘর গুলো ভেঙ্গে পরে গেল সাথে অপেক্ষাকৃত নীম্নমানের ঘরগুলোর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেল।বানভাসি মানুষগুলো রাস্তার ওপরে টং ঘর করে বাস করতে লাগলো।আমাদের বাড়ি আর মসজিদটাকে বন্যার পানি ছোঁয়নি।বড় ফুফুদের বাড়ি ডুবে যাওয়ায় তারা আমাদের নির্মাণাধীন দোতলা ঘরে এসে উঠলেন।ফুফাতো ভাইবোনদের সাথে অনেক ভাল সময় কাটতো বিশেষ করে গোলাপীর সাথে।বেলা এগারোটা থেকে রেডিওতে শুরু হতো বানিজ্যিক সিনেমার গান।যা একটানা চলতেই থাকতো।তখনকার দিনে এটা ছিল বড় ধরনের বিনোদন।তাছাড়া বিভিন্ন বিয়ের অনুষ্ঠানে মাইক বাজানো হতো।কাজী মাইক ছিল নামকরা।দূর থেকে মাইকে ভেসে আসতো “ঘুনাই বিবির যাত্রা”।ঘুনাই বিবি গাইতো-” ও কোকিল ডাইকোনা ডাইকোনা..এই বসন্তকালে..!শীত বসন্ত সুখের কালে মোর পতি নাই ঘরে..।”ঘুনাই বিবির জন্য না বুঝেই মন কেমন করতো।
কিংবা বিয়ের বাড়ির মাইকে ও পাড়ার ছটফটানী কোন মেয়ের কন্ঠে শোনা যেত-” গাঙ দিয়্যা যায় রো ত্যাজপাতার লাও রো ত্যাজপাতা লিবু নাকি তুরা রো সখি…।”
যাইহোক ৮৮ এর বন্যায় চারিদিকে হাহাকার।ক্ষুধা!দরিদ্র মানুষরা কচু ঘেচু খেত।ভাল,খাবার জুটতোনা। উল্কা ভাই বেবি আপাদের বাড়ির টিভিতে গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ বন্যা পরিস্হিতির খবর দেখতে আসতো।সবার ঘরে বিদ্যুৎ নেই।একটা টেলিভিশন তখন অনেক বড় ব্যাপার।তখন প্রেসিডেন্ট এরশাদের গান-” আমি যেতে চাই বাংলার মানুষের কাছে।”

গ্রামে আর্মিরা চলে এলেন।স্পীডবোডে চড়ে বন্যা পরিস্হিতি দেখতেন,ত্রাণ দিতেন।আব্বা মানুষের নাম লিষ্ট করতেন আমি পাশে দাঁড়িয়ে দেখতাম।আমাদের বাড়ির পাশের হাটখোলায় ত্রাণ দেয়া হতো।আমি গিয়ে বসে থাকতাম।শুকনো মুখে মানুষগুলো ঘন্টার পর বসে থাকতো ত্রাণের জন্য।চালের সাথে সাথে গুড়ো দুধ,টিনজাত খাবার ছিল।মানুষগুলো খুব কষ্টে ওগুলো নিয়ে বাড়ি যেত।একবার এক আর্মি আমাকে অনেক চকলেট আর কু’শিল( আখ) কিনে দিয়েছিল।তখন স্কুল ছুটি ছিল বলে সারাদিন আব্বার সাথে গিয়ে বসে থাকতাম।খাওয়াদাওয়ার কোন খেয়াল থাকতোনা।বন্যার পর ডায়রিয়া মহামারী।গ্রামে গ্রামে নীল শাড়ী পরা মহিলারা কিভাবে খাবার স্যালাইন বানাতে হয় সেটা শেখানোর টীম আসতো।আধা লিটার পানিতে এক চিমটি লবন,একমুঠ গুড় অথবা চিনি দিয়ে চামচ দিয়ে নেড়ে স্যালাইন তৈরি করা শেখানো হতো।সে সময়ে বাংলাদেশ আার্মিদের ভূমিকা ছিল সত্যিই অসাধারণ।যা মানুষ টেলিভিশন ও স্বচক্ষে দেখেছে।

আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তাটা মাটি কেটে কেটে প্রশস্ত ও উঁচু করা হলো।দল বেঁধে মহিলা পুরুষরা মিলে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে ডালিতে নিয়ে একজনের মাথায় তুলে দিত।সে আবার একটু দূরে গিয়ে আরেকজনের মাথায় তুলে দিত।এভাবে পর্যায়ক্রমে কয়েকজনকে পার করে রাস্তায় গিয়ে নীচু থেকে উঁচুতে রাস্তায় মাটির পর মাটি পরতো।রাস্তার দুপাশের ছোট ছোট পুকুরগুলোর ত্যাগে আজকের এই রাস্তা।ডুলি খালা,মেন্নুু ফুফু,খোদেজা ফুফুরা সকালবেলা দুটো শুকনো রুটি সাথে একটু খেজুরের গুড় কিংবা খেসারীর ডালছানা( ডালভর্তা) না হয় একটু শব্জি ভাজি থালায় নিয়ে গামছা দিয়ে বেঁধে মাটি কাটতে চলে আসতো।গ্রীষ্মের প্রখর রোদে খড়খড়ে মাটি কেটে,ঘাম ঝড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে গাছের নীচে বসে শুকনো রুটি খেতেন।তখনকার দিনে রুটি গরীবের খাবার।আমি দেবদারু গাছ ধরে দাঁড়িয়ে দেখতাম।ডুলি ফুফু আমাকে বলতেন, -“সরদারের বিটি রুটি খাবু?”আমি নাহ বলতাম।কিন্তু আমার খেতে মন চাইতো।পরিশ্রমী মানুষগুলোর সেই খাওয়ার দৃশ্য অতুলনীয়।বর্তমান সরকারের আমলে আমাদের সেই জীর্ণ শীর্ণ রাস্তাটা অনেক সুন্দর।মানুষের চলাচলের সুবিধা হয়েছে।সেই নেপথ্যের কারিগর ডুলি খালা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন।চলে গেছেন তার টীমের আরো অনেকে।পরপারে আল্লাহতায়ালা নিশ্চয়ই তাদের ভাল রাখবেন।আমিন।আমার ক্লাসের তিন রোলের পিতৃহারা রওশনকে কয়েক বোন মিলে মাটি কেটে কেটে টাকা জমিয়ে পড়াতো।মাঝে মাঝে মনে হতো দুই রোলের সেলিনা আর আমাকে পড়ালেখায় ল্যাং মেরে টপকে যাবে।রওশন লাজুক ছিল।খোদেজা ফুফুদের অনেক চেষ্টা সত্বেও রওশন পড়ালেখায় এগুতে পারেনি।আমার মা স্কুল গভর্নিং বডিতে থাকায় আমার পড়ালেখার খুঁটিনাটি খবর নিতেন।তৃতীয় শ্রেণিতেবিজ্ঞানে খারাপ করেছিলাম।বাড়িতে ভীষন বকা খেয়ে মতিন স্যারকে দোষ দিয়েছিলাম।বলেছিলাম স্যারের ক্লাস বুঝিনা।তারপর স্কুলে গিয়ে স্যার অনেক ধমকে দিয়েছিলেন।বলেছিলেন কিরে তুই নাকি আমার পড়ানো বুঝিনা!সে কি রাগ মতিন স্যারের!যাইহোক কয়েক বছর আগে রওশনের কাছ থেকে শুধুমাত্র শাড়ী ঝুলানোর আলমারী বানিয়ে নিলাম।ও আমার আলমারী সংক্রান্ত প্রয়োজন হলে পাশে থাকে।

ময়লাহাতে ক্লাসমেট বিলকিস কৎবেল খেত।যে খাবারটা আমার কাছে ছিল লোভনীয়।আমি আর গোলাপী ওর নানীর গাছের কৎবেল খাওয়ার জন্য ওর পিছে ঘুরতাম।যেটা ফরহাদ ভাই এর খুব অপছন্দের বিষয় ছিল।বলতেন ওর নোংরা হাতের খাবার কেন খাস!বিলকিস আমার খেলারসাথী।বড় হবার পর বিলকিস জীবনযুদ্ধে নানা প্রফেশনে জড়িত হয়ে পরে।শেষে গার্মেন্টসে চাকরী করতো।আমার প্রেগন্যান্সীর সময়ে কিছু জটিলতা সৃষ্টি হয়।আমাকে নিয়মিত চেকআপে থাকতে হতো।শুনেছিলাম বিলকিস সংসার,চাকরী হারিয়ে গ্রামে অবস্হান করছে।আমি ওকে ফোন করে বললাম আমার কাছে চলে আয়।সেসময়ে ঢাকাশ মুগদাপাড়ার বাসায় আমার একলা সময়ের একমাত্র সঙ্গী ছিল বিলকিস।আমার বারডেমে সিজারিয়ান বেবি হওয়া পর্যন্ত সে অনেক সুন্দরভাবে আমাকে দেখাশোনা করেছে।ওর ঋণ আমি শোধ করতে পারবোনা।ছোটবেলায় যেমনি অপরিষ্কার ছিল বড়বেলায় তেমনি গোছালো ও পরিষ্কার।আমার রুম দিনে দুবার মুছতো।কত রকমের উপকরণ দিলে আমার পরোটাটা আমি মজা করে খেতে পারবো তারজন্য চলতো এক্সপেরিমেন্ট। আমার মায়ের জন্য বারডেমে রান্না করেও নিয়ে যেত।আমার বেবিকে দেখাশোনা করতো।

আমাদের সময়ে ক্লাস ফাইভে সমাপনী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল নাজিরপুর হাইস্কুলে।সে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।আমি আব্বার সাথে লালসাদা রঙের লেস,নেটের রাণী ফ্রগ ও কালো প্রিন্টের গাউন পরে পরে পরীক্ষা দিতে যেতাম।পরীক্ষা শেষে স্কুল ছুটি হয়ে গেলে নানারবাড়ি,খালাদেরবাড়ি চলনবিল এলাকায় যাওয়া ছিল এক আনন্দময় দিন!আমার সিনিয়র কাজিনরা ছিল কৌতূহলের আর ভালোলাগার বিষয়।

প্রতিটি প্রাপ্তি, সম্পর্ক আর ভালোবাসার দায় মানুষকে চুকাতে হয়!

চলবে….

আপনার মতামত লিখুন :